গল্প- ঢালু বাঁকে আটকে থাকা জীবন।

গল্প- ঢালু বাঁকে আটকে থাকা জীবন।
ইসরাত জাহান।
১.
রাস্তাটা উঁচুনিচু ত্যাঁড়াব্যাঁকা ইট বিছানো। তাড়াহুড়ো করে হাঁটতে গেলে উপড়ানো ইটের কোনায় স্যান্ডেল আটকে হোঁচট খেতে হয়। তারপরও রমিলা দ্রুত হাঁটে। সারাদিনে অনেক কাজ। তিন বাসার ছুটা বুয়ার কাজ শেষ করে, ‘সন্ধ্যার পরে গনি মিয়া ট্রি স্টলে’ গিয়ে বসতে হয়। তারপরে ঘরে ফিরে তিনমাস বিছানায় পড়ে থাকা অসুস্থ স্বামী ও ছোট ছেলেকে খাইয়ে ঘুমতে হয়। সকালে ঘুম ভাঙার পরে শুরু হয় ছোটাছুটি। ছয় ঘরের জন্য বরাদ্দকৃত একটি গ্যাসের চুলায় সারাদিনে খাবার গুছিয়ে ছুটতে হয় বড় সাহেবের বাসার সকালের নাশতা গোছাতে। তখন থেকেই শুরু হয় সারাদিনের ছুটে চলা। সন্ধ্যার পরে চায়ের দোকানে বসে একটু জিড়ানো হয়। তাও নির্ভর করে কাস্টমারের উপরে। লোকজন একসাথে এলে সময়ের সাথে হাত দুটো কাজগুলো গুছিয়ে নিতে পারে না। লোকজন তাড়া দেয়। রমিলা হাঁপিয়ে ওঠে।

২.

গনি মিয়া তিন মাস বিছানায় শুয়ে আছে। আগে একবেলা রিকশা চালাতো,
সন্ধ্যার পরে চায়ের পসরা সাজিয়ে বসতো। যত রাতই হউক, সব লোকজনকে বিদায় দিয়ে টাকা পয়সা গুছিয়ে ঘরে ফিরতো। এখন ভাঙা পা নিয়ে সারাদিন ঘরে শুয়ে থাকতে হয়। বউটা সেই সকালে বের হয়, দুপুরে দৌড়াতে দৌড়াতে ঘরে ফিরে, স্বামী ও ছোট ছেলেকে খাইয়ে আবারও ঝড়ের বেগে চলে যায় বাকি কাজগুলো করার জন্য। ঠিক মতো কথাও বলে না। বড় ছেলে মাদ্রাসায় হাফেজি পড়ে। পড়াশোনা সাথে কাজও করে। তাইতো বিনাবেতন পড়ার সুযোগ পেয়েছে। মেয়েটা গনির মায়ের বাড়ীতে থাকে। মাঝেমাঝে ফোন করে টুকটাক কথা বলে। মেয়েটার নাম ফুলমনি, দেখতে ফুলের মতো। তাইতো বস্তির এই ঘিনঘিনে ঘরে মেয়েটাকে রাখেনা। পাঁচ বছরের ছোট ছেলেটা নিয়ে আধাখ্যাঁচড়া সংসার। বাসের তলে পিষ্ট হয়ে বাম পাটা হারিয়ে এখন সংসারের বোঝা হয়ে আছে। অনেক স্বপ্ন ছিলো শেষ বয়সে গ্রামে একটা বাড়ি তুলে তিন সন্তান বউকে নিয়ে আরামে থাকবে। সেই স্বপ্ন এখন মরীচিকা হয়ে গেছে।

৩.

ওভার লক মেশিনে সুতা পরানো একটা ঝামেলা। একের পর এক ছিদ্র দিয়ে সুতা টেনে জায়গায় জায়গায় প্যাঁচ খাইয়ে শেষমেশ জোড়া সুইয়ের মাথায় সুতা ঢোকান।আশপাশে সারি সারি মেশিনে ঘরঘর শব্দে মাথা ধরে যায় মর্জিনার। তারপরেও নিরবে কাজ করে যায়। মাঝেমাঝে মেজাজ গরম হয় সুপারভাইজার আলতাফের ধমক খেয়ে। লোকটা নানা বাহানায় পাশ ঘেঁষে দাড়ায়, কথা বলার ছলে চোখ দিয়ে লেহন করে ওর শরীর। অস্বস্তি হয় , তখন প্রতিবাদ করে কিছু বললেই ওভারটাইম থেকে নাম সরিয়ে দেয়।তাইতো চুপ করে থাকে । সারামাস এতো খাটুনীর পরে হাতে আসে মোটে এগারো হাজার টাকা। ঘর ভাড়া, দুইজন মানুষের খাওয়ার খরচ সামলে হাতে থাকে অল্প কিছু। কালভাদ্রে বেকার স্বামীর উপর চড়াও হয়, ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি করে কাটে সেদিনের দিনরাত্রি।

৪.
সকালে পান্তাটা মুখে দিয়েই জয়নাল গালাগালি শুরু করে বউকে। বউটা গার্মেন্টসে থাকায় আশপাশের ঘরের লোকজন কিছুটা শান্তি পায়। তা না হলো এতোক্ষনে ঝগড়া, মারামারি, কিলঘুষি খাওয়ার দৃশ্যে সরগরম হয়ে উঠতো বিজলী বস্তির এমাথা ওমাথা। জয়নাল সারাবেলা ঘরে থাকে, তাস খেলে, বৌয়ের টাকায় বিড়ি খেয়ে কাটিয়ে দেয়। মাসের প্রথমদিকে বাসাবাড়ি, অফিসের মালামাল, ফার্নিচার একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় ওদলবদলের কিছু কাজ করে। সেখান থেকে যা পায় তাতে সাতদিনের বাজার না জুটলেও, সারামাস ভাদাইমা, অর্কমা গালিগুলো জুটে যায়। তারপরও জয়নাল ঘরে শুয়ে বসে কাটিয়ে দেয়। কাজ করতে ওর ভালো লাগে না। গ্রামে থাকাকালীন চেয়ারম্যানের আশপাশে ঘুরঘুর করতো। নেতার ফুটফরমাশ খাটাত আর মটোরসাইকেলের পিছনের সিটে বসে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়াতো। হঠাৎ খুনের মামলার সাক্ষী করায় শহরে পালিয়ে এসেছে। বউটা শহরে এসে কাজ জোটালেও জয়নাল বেকার থেকে যায়।

মাঝেমাঝে “গনি মিয়ার ট্রি স্টলে ” গিয়ে বসে। মর্জিনার চোখ এড়িয়ে রমিলাকে সাহায্য করতে মন চায়। মাঝেমাঝে করেও, বেশীভাগ সময় মর্জিনার সামনে ধরা পড়ে যায়। তবে চায়ের দোকানে বসলে রমিলা বিনাপয়সা চা খেতে দেয়। টুকটাক সুখদুঃখের গল্প করে। ভালো লাগে জয়নালের। ওখানে বসে বিড়ি টানতেও সুখ লাগে।

আজ দুপুরে রমিলা ঘরে ফিরেছে মুখ কালো করে। দুই বাসার ম্যাডাম আগামীকাল থেকে কাজে যেতে নিষেধ করে দিয়েছে। নতুন নাকি একটা রোগ এসেছে, যে রোগ আপন পর মানে না। যাকে ছোঁয়, সেই নাকি অচ্ছুত হয়ে পড়ে সকলের কাছে। হিন্দু ঘরের মেয়ে রমিলা, মুসলমান গনিকে বিয়ে করে এখন ওর পরিবারের কাছে অচ্ছুত। নতুন করে অচ্ছুত হতে ভয় লাগে। অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ সব বন্ধ করে দিয়েছে। কবে খুলবে কেউ জানে না। আরো বলা হয়েছে, যতদিন এই রোগ দুর না হয়,ততদিন ঘরেই থাকতে হবে। ঘরে ফেরার পথে বস্তির ম্যানেজার জানায়, টি স্টলটি খুলতে নিষেধ করে গেছে পুলিশ । কোথাও যেন লোক সমাগত না হয়,তাও বলে গেছে। এই কথা শুনে রমিলা ঘরের দুয়ারে এসে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। রমিলাকে কপালে হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখে পাশের এসে দাঁড়ায় মর্জিনা। ওর গার্মেন্টসও বন্ধ করে দিয়েছে বেতন না দিয়ে। হাতের কাছে যা আছে তাই নিয়ে গ্রামে চলে যাবে বলে ঠিক করেছিলো।খুনের সাক্ষী জয়নালের কারনে ঘরে ফেরাটাও অনিশ্চিত। গনি মিয়া বউকে দুয়ারে দেখে শোয়া থেকে উঠে বসে। নতুন ঘরের স্বপ্নটা তার কবে ধুলায় মিশে গেছে। গনি মিয়া বুক কেঁপে রমিলার কাজের অনিশ্চিয়তায়। রাতে সরগরম হয়ে উঠা বস্তি ওইদিনের পরে নিরব হয়ে যায়।

পনেরো দিন পরে জয়নাল আজ বেশ খুশী, ওর্য়াড কমিশনার ওকে ডেকে পাঠিয়েছে। বিজলী বস্তির সবার নাম, ফোন নম্বর, আইডি কার্ডের ফটোকপি জোগার করতে বলেছে। কার্ড বানিয়ে সবাইকে নিত্যপ্রয়োজনীয় শুকনা খাবার দেবে। ক্ষুধায় কষ্ট পাওয়া খেটে খাওয়া দুর্বল মানুষগুলো হঠাৎ রোগ শোক ভুলে যায়। ঢালু বাঁকে আটকে থাকা বাস্তচুত্য জীবনগুলো আবারও আশার আলো দেখে। নতুন করে বেঁচে উঠতে চায় করোনাময় পৃথিবীতে।

আরও পড়ুন

সর্বাধিক পঠিত