বীথির বানান ভুল

শহীদবাগের মসজিদ পেরোতেই তেড়েফুঁড়ে বৃষ্টি নামলো। আমি গা বাঁচাতে কোথাও ঢুকে পড়বো কি—না এমন চিন্তা করতে করতেই ভিজে গেলাম। আর মাত্র দেড়—দু’মিনিট হাঁটলেই নীতুদের বাড়ি। ১৭২/এ। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই চলে এলাম। ওদের বাড়িতে কলবেল নেই। দু’তলা পুরনো ধাঁচের বাড়ি। গেটের ওপর গোলাপি রঙা বোগেনভিলিয়া ছড়ানো।
কড়া নাড়তেই দৌঁড়ে এলো নীতু। ‘স্যার’ বলেই একটা মৃদু চিৎকার দিয়ে দ্রুত দরজা খুলে দিল। আমি খুব স্বাভাবিক ভাবেই ওদের বসার ঘরে চলে এলাম। এরমধ্যে ও একটা গামছা নিয়ে এসেছে। ফ্যানটাও ফুল স্পিডে ছেড়ে দিয়েছে। নীতুর হাত থেকে গামছা নিয়ে বললাম, তোমার আম্মু নেই। প্যান্ট কম ভিজেছে তবে শার্টের অবস্থা যাচ্ছেতাই। ভেতরে শ্যান্ডো গেঞ্জি পরি না। নীতু বলল, আমু রান্নাঘরে।

এই একটা অদ্ভুত সময়। আষাঢ় মাস আসতে এখনো অনেক দেরি, অথচ বলা নেই কওয়া নেই হুট হাট বৃষ্টি। রাস্তাঘাটে বৃষ্টি লাঞ্ছনা যেন এখন কমন। ছাতা নিয়ে বের হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বের হওয়ার ঝকঝকে আকাশ দেখে আর নিইনি ছাতা। একটা সময় বৃষ্টি আমাদের কত প্রিয় ছিল। অনর্থক রিকশায় মিলিকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। পলাশী থেকে বাবুবাজার ব্রিজের তল।
শরীর ভালো করে মোছার পরেও একটা অস্বস্তি কাজ করছে। এরমধ্যে ওর মা এসে বলল—শার্টটা খুলে ফেলতে। আমি বারবার না বলায় ক্ষান্ত দিলেন। নীতুকে বললেন, জানালা খুলে দিতে। বৃষ্টি সম্ভবত কমে এসেছে। নীতু জানালা খুলে দিয়ে বলল—
‘স্যার, আজকে পড়াবেন?’
আমি ওর দিকে তাকালাম। মেয়েটা বড় হয়ে যাচ্ছে। কথা বলার ধরনেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।
—’পড়াবো। যেহেতু এসেছি।’
সোফার সেন্টার জায়গাটাতে বসলাম। নীতু সামনের চেয়ারে বসতে বসতে গামছাটা হাতে নিয়ে এগিয়ে এল।
—’স্যার আপনার কানের কাছে পানি।’
বলেই গামছা আমার মাথার কাছে ধরতেই আমি ঝটকায় সরে গিয়ে বললাম—
‘দাও দাও, আমিই মুছে নিচ্ছি সমস্যা নেই।’
বলেই গামছাটা নিয়ে গলার দিকটা মুছতে শুরু করলাম। নীতু হাসছে। হাসলে স্নিগ্ধ লাগে। ঠোঁটের কোনটা কেমন যেন ভাঁজ হয়ে যায়। সামনের চেয়ারে বসলো।
—’স্যার আপনি এমন কেন?’
—’কেমন?’
—’এই যে লাফ মেরে সরে গেলেন?’
নীতুর ভাবগতি বোঝা আমার জন্য ইদানীং দুর্বোধ্যই ঠেকে। অষ্টাদশী। খুব আবেগপ্রবণ হয় আর এক্সাইটমেন্ট কাজ করে এটা জানা। তবে নীতুটা একটু আলাদা। খুব সামান্য। এই ‘সামান্যটুকু’টাই ধরতে পারি না। নীতুকে আমি ফিজিক্স পড়াই। ও ভিকারুননিসায় একাদশে পড়ে। ফাইনাল দেবে।
নীতুকে পড়ানোর বিষয়টা আকস্মিক ছিল। অবশ্য টিউশনি জিনিসটাই আকস্মিক আসে। হুট করে পল্লব ফোন দিয়ে জানালো একটা হেল্প করতে পারবি? কী হেল্প। সে ফোনে জানালো না। হেল্প বলতে টাকা পয়সার বিষয়টাই চলে আসে। মাস্টার্স শেষ করে চাকরির চেষ্টা করছি, আর মগবাজারে একটা টিউশনি করি। মাস শেষ হবার আগেই ধারদেনা শুরু করতে হয়। হলে থাকি বলে রক্ষা। না হলে ঢাকা ছেড়ে কবে বিদেয় নিতে হতো।
পল্লবের সাথে দেখা করলাম মৌচাক মার্কেটের পেছনে। টাকা পয়সার হেল্প আমার দ্বারা সম্ভব না। এটা ফোনেই বলে দিলে ভালো হতো। কিন্তু ও তো সরাসরি কিছু বলল না। পল্লব দুই কাপ চা নিয়ে বাংলা টিভির গলির ভেতর নিয়ে গেল আমাকে।
—’দোস্ত বিপদে পড়েছি।’
—’বল।’
—’তুই একমাত্র ভরসা।’
—’বুঝলাম আমি ভরসা। এমনভাবে কথা বললে মেজাজ খিঁচড়ে যায়। শালা কি বলবি বলে ফেল।’
—’শোন, আমি একটা চাকরি পেয়েছি। পার্মানেন্ট না, পরিসংখ্যান ব্যুরোর একটা প্রজেক্ট। বেতন খারাপ না। তবে কাজ করতে হবে আমাকে কুমিল্লাতে।’
—’এটা তো ভালো সংবাদ। এইখানে আবার আমার হেল্প এর কি আছে।’
—’না মানে আমি কয়েকটা টিউশনি করতাম। সেসব ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু একটা টিউশনি কোনোভাবেই ছাড়তে পারছি না।’
—’তোকে কি বেঁধে রাখছে?’
—’আরে না। সমস্যা হচ্ছে মেয়েটার এসএসসি পরীক্ষা। অন্তত ফিজিক্স কেমিস্ট্রিটা যদি তুই দেখে দিতিস।’
আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। বুকের মধ্যে কোথাও যেন আনন্দের ফুলকি স্পার্ক করলো। এইসময় একটা টিউশনি আমার জন্য শাপে বর। আমি তাঁকে হেল্প করবো বলে নিশ্চিত করলাম। অথচ এটা আমার জন্য কী পরিমাণ হেল্প সে করলো কল্পনাও করতে পারেনি।
ওইদিনই আমাকে নীতুদের বাসায় নিয়ে আসে পল্লব। পড়াতে শুরু করলাম। নীতু এসএসসিতে জিপিএ ফাইভ পেল। ভর্তি হলো ভিকারুন্নিসাতেই। আমাকে ছাড়লো না ওরা। বেতন শুরুতে ৫ হাজার হলেও এখন ৭ হাজার। মাসের প্রথম সপ্তাহেই টাকা পেয়ে যাই। দুই টিউশনি মিলে ১৪ হাজার। খারাপ না। কিছু অংশ বাসায় পাঠাতে পারি।
নীতু বই খুলে বসেছে। সরণের অধ্যায়। নীতুর বড়বোন বীথি ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। চা আর সমুচা। আমি তার দিকে তাকাতেই সে চোখ নামিয়ে নিল। নীতু বিষয়টা খেয়াল করলো। বীথির এটা দায়িত্ব। নীতুর চেয়ে বীথি চার বছরের বড়। সিদ্ধেশ্বরীতে ম্যানেজমেন্টে অনার্স পড়ে। সপ্তাহে চারদিন পড়াতে আসি, এই চারদিন সে সুন্দর দায়িত্ব পালন করে যায়। সেই প্রথম থেকেই। সত্যি কথা বলতে বীথির শরীরে একটা আভা আছে। মাঝে মধ্যে যখন চা শেষ হয়ে যায় বীথি পান নিয়ে আসতো। একটা সময় পানের অভ্যাসই হয়ে যাচ্ছিল। নীতু বকতো—
‘আপু তুই স্যারকে পান খাওয়াস কেন, স্যারের দাঁত লাল হয়ে যায় না?’
নীতুকে পড়িয়ে যখন বের হলাম তখন মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেছে। শহীদবাগের মসজিদ থেকে মুসল্লীরা বের হচ্ছে। রাস্তায় পানি জমে এখন কাদা কাদা। আমি হেঁটে হেঁটে মালিবাগ মোড় পর্যন্ত চলে এলাম। মালিবাগ মোড় তখন কাদা—পানিতে বিচ্ছিরি অবস্থা। সাইকেল চালিয়ে একজন মুরব্বী পাশ দিয়ে যেতেই ছলকে আসলো ময়লা মিশ্রিত পানি। প্যান্টের নিচের অংশটা ভিজে গেল। শুধু ভিজে গেলেও সমস্যা ছিল না, কিন্তু প্যান্টে লেগে গেল বালি—কাদা। ফাল্গুন পরিবহনের একটা বাস আসছে। দরজা আধো খোলা খোলা। লাফ মেরে হ্যান্ডেল ধরে ফেললাম হেল্পার নামিয়ে দেবে দেবে করতেও শেষ পর্যন্ত উঠিয়ে নিয়ে একেবারে পেছনে চলে যেতে বলল।

ঘুম থেকে উঠে ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালাম। হলের সামনের অংশটা ছোট ছোট ঘাসে ভর্তি। কিছু বাহারি গাছ লাগানো হয়েছে। ফুল—টুল নেই। তবে কয়েকদিনের বে-নিয়মের বৃষ্টিতে সবকিছুই যেন সতেজ আর সজিব দেখাচ্ছে। রম্বস আকারে হলের এই অংশের একেবারে ওপারের বারান্দায় চিৎকার—চেঁচামেচি লেগে গেল। দাঁতের ভেতরের দিকে ব্রাশ পৌঁছানোর চেষ্টা করতে করতে বোঝার চেষ্টা করলাম ঘটনা কী। ইদানীং নাকি চোরের উপদ্রব বেড়েছে। কারো জুতা থাকে না, কারো প্যান্ট জামা থাকে না। সেদিন ওয়েটিং রুমের সামনে একজন চোরকে পেটানো হচ্ছিল, কার নাকি তালা ভেঙে সাইকেল নিয়ে পালাতে ধরেছিল চোর।

ওয়াশরুমে এসে হাতমুখ ধুয়ে রুমে ঢুকতেই খেয়াল হলো—সম্ভবত ফোন বেজে থেমে গেল। একাধিকবার ফোন এসেছিল। চারটা মিসডকল। নীতুর আম্মুর নম্বর। ফোন ব্যাক করলাম। নীতুই ফোন ধরলো। আজ সন্ধ্যার পর পড়াতে যেতে বলল। আমি নীতুকে ‘ওকে’ বলে দিলাম। হলের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তারপরেও কোনো মতে টিকে আছি। রুমমেট সব জুনিয়র। ভরসার কথা তারা সম্মান করে, কিছুটা ভরসাও রাখে। কেননা আমার এক বন্ধু শামীম সরকারি দলের ছাত্রনেতা। প্রভাব আছে।

১১টা বাজে। লাইব্রেরিতে যাওয়া যেতে পারে। কিংবা নীলক্ষেত। তার আগে নাস্তা করে নিতে হবে। দুয়েকটা পড়ার বই কেনা দরকার। কিন্তু নীলক্ষেতের কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে। কোত্থেকে চলে আসে মিলি। মাথাময় ঘুরে বেড়ায়। সদ্য সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি। নীলক্ষেতে দাঁড়িয়ে বই কিনছিলাম। বুদ্ধদেব, বিভূতি, সমরেশ, সুনীল, নবোকভ, মার্কেজ। অধিকাংশই সংকলন। বিভূতির একটা সংকলন হাতে নিয়ে বললাম
—’কতদাম?’
—’দেড়শ’
অনেক চেষ্টা করলাম কমাতে, সে দেড়শই নিল। আরও দুয়েকটা নাড়াচাড়া করছি। তামাটে চেহারার টানা টানা চোখের এক মেয়ে হাতে তুলে নিল শীর্ষেন্দু’র একটা বই। জিজ্ঞেস করল দাম-
—’একদাম বলব নাকি, দামাদামি করবেন?’
—’আহা বলেন না দাম…’
—’সাড়ে তিন’শ টাকা…’
—’কি?’
আমি বললাম
—’মামা একদাম বলেন, আমার পরিচিত…’
—’দেড়শ…’
মেয়ে চোখ গোল করে আমার দিকে তাকালো। আমার এক কথায় বইয়ের দাম দুইশ টাকা কমে গেল অথচ তার চোখে কৃতজ্ঞতা কিংবা বিস্ময় কিছুই নেই।
—’আচ্ছা মামা একদামে এতো কমাচ্ছেন কেন?’
‘আসলে মামা এইখানে সবগুলা বইয়ের দামই দেড়শ টাকা। দেড়শ’র একটাকা কমে বেচতে পারব না। এখন অনেকে দামাদামি করে এই জন্য বাড়ায়ে বলি… আমি যেই দাম বলব তার অর্ধেক বলবেই…’
মেয়েটা দোকানওয়ালার কথায় ফিক করে হেসে দিল। দাঁত বেশ সাজানো।
আমি রিকশা ভাড়া করছি। রিকশাওয়ালা বেশি চাচ্ছে, পেছন থেকে সেই মেয়ে কোত্থেকে উদয় হয়ে রিকশাওয়ালাকে বলল,
—’একদাম বলুন…’
বিস্মিত হতে গিয়েও পারলাম না, এলোমেলো দাঁত নিয়েই হেসে ফেললাম। রিকশা উঠে বসে বললাম, উঠে এসো… মেয়ে উঠে এলো। নাম মিলি।
সে বছরই রোকেয়া হলে সিট পেয়েছিল মিলি। বলা যেতে পারে আমিই শামীমকে ধরে সিটটা ম্যানেজ করে দিই। যদিও শামীম তখন উঠতি নেতা। তারপরেও বড় নেতা ধরে ম্যানেজ করে ফেলেছিল। এরপর প্রায় সন্ধ্যাগুলোই কাটতো রোকেয়া হলের গেটে, শামসুন্নাহার হলের সামনে কিংবা ফুলার রোডে। বৃষ্টিদিনে বাবু বাজার ব্রিজের তলে। মিলির সাবজেক্ট অর্থনীতি আর আমার বাংলা। দিনে একাধিকবার দেখা হবার জন্য ভিন্ন ডিপার্টমেন্ট কোনো বাধাই হলো না। দেখা হয় যখন তখন। আমরা কেমন যেন সুখী ছিলাম বেশ। মিলির চোখগুলোও ছিল সুখী চোখ।

ফাইনাল ইয়ার পরীক্ষার ৩মাস পর মিলি বিয়ে করে চলে গেল অটোয়াতে। অবশ্য পুরো ফাইনাল ইয়ার জুড়েই তার সাথে একটা বিভাজনের রেখা তৈরি হচ্ছিল। তারই বা দোষ কোথায়? আমার কাছ থেকে নিশ্চিত কথা নেওয়ার চেষ্টা করছিল বিয়ের বিষয়ে। আমি কীভাবে নিশ্চিত হবো এটা বুঝতে বুঝতেই পরীক্ষা চলে এলো। এরপর সে ক্যাম্পাসে আসা কমিয়ে দিল। ফোনেও তেমন একটা কথা হচ্ছিল না। আমি একদিকে চাকরির চেষ্টা করি অন্যদিকে, টিউশনি। মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হ ওয়ার পর জানতে পারলাম মিলি আর হলে ফিরবে না।

লাইব্রেরির দিকে হাঁটতে হাঁটতে খুব মনে হলো মিলির কথা। মাঝে মধ্যে কিছুটা হাসিও এলো। সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার আগে আমাদের কোনো ক্যালকুলেশন থাকে না। কোনো সমীকরণই আমরা মেলানোর চেষ্টা করি না। প্রেম—এমনই একটা বিষয়; ঢেউয়ের মতো ছুটে এলে গা ভাসাতে দ্বিধা করি না। যাক না, যেদিকে স্রোত। হাকিমে এসে একটা টোস্ট আর চা খেয়ে লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়লাম। আজ মগবাজারের টিউশনিটা নেই। সন্ধ্যার আগে কোনো চিন্তা নেই।

নীতুদের বাসায় এসে বসে আছি। সন্ধ্যার পরেই এসেছি। কিন্তু নীতু পড়তে আসছে না। চা আর ডিমের ওমলেট দিয়ে গেল বীথি। যাওয়ার সময় একটু প্রশ্রয়ের হাসি হেসে গেল। কোনোকিছুই উপলব্ধি করতে পারছিলাম না। নাকি এরা আজ আমাকে টিউশনিতে ‘না’ করে দেবে? হতেও পারে ইদানীং নীতুর যে আচরণ, এসব আচরণ খুব সহজেই অভিভাবকেরা বুঝতে পারে। নীতু পড়াশোনায় ভালো। তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু পড়ার সময় মাঝে মধ্যেই নিজের চেয়ার থেকে উঠে পাশে চলে আসে। ভালো ভাবে বুঝিয়ে নেওয়ার উছিলা। যদিও আমি বুঝি, চেষ্টা করি সামলে নিতে। কিন্তু অভিভাবকেরা কেন ঝুঁকি নেবে।

এসব ভাবতেই বুকের ভেতর ড্রাম বাজার মতো শব্দ পেতে লাগলাম। এই টিউশনি হারালে একেবারে বিপদে পড়ে না গেলেও মোটামুটি একটা ঝড় বয়ে যাবে। ঘণ্টাখানেক পরে ঘরে ঢুকলেন নীতুর মায়ের সাথে ঢুকলেন ফুপু। এই ফুপুকে চিনি মোমেনা বেগম। কেরানীগঞ্জের থাকে। নীতুদের এই বাসাটাও নাকি অর্ধেক তাঁর। বসলেন পাশের সোফায়।
—’তা বাবা শরীর ক্যামন?
—’জ্বি আন্টি ভালো।’
কী কথা হবে এখন আমাদের। নীতু কিংবা বীথি কেউই নেই। কিছুটা অপ্রস্তুত লাগছে। আমি বাসার ভেন্টিলেটরের দিকে তাকাই। সেখানে মাকড়শা বাসা বেঁধেছে। পাশে একটা টিকটিকি। তার নিচে মলিন হয়ে যাওয়া ফুটবলার মোনেম মুন্নার একটা পোর্ট্রেট ছবি।
—’খোলাখুলি কথা বলি কি বলো?’
—’জ্বি জ্বি’
—’বিয়ে কবে করবা?’
‘আন্টি আসলে বয়স তো হয়ে গেছে। কিন্তু চাকরি একটা না পাওয়া পর্যন্ত বিয়ের চিন্তা তো করা যায় না।’
—’তা ভুল বলো নি।’
নীতুর আম্মু চুপচাপ। ফুপু মোমেনাই কথা বলে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছে উদ্দেশ্য কিছু একটা আছে আবার নাও থাকতে পারে। কিন্তু-
‘আমাদের বীথিকে তোমার কেমন লাগে?’
প্রায় চমকে উঠলাম। নীতুর আম্মু কিছুটা আগ্রহী হয়ে রয়েছেন। উত্তর নেওয়ার জন্য যেন প্রস্তুত ফুপু। আমি নিজেকে সামলে নিলাম। ভেতরে একটা গোলানো অনুভূতি। জানি না। বললাম।
—’হ্যাঁ বীথি তো সুন্দর, ভালো।’
—’তোমার ক্যামন লাগে তাকে?’
নীতু চলে এসেছে। মায়ের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। জিহ্বা দিয়ে ওপরের ঠোঁট একটু ভিজিয়ে আমার দিকে তাকালো। আমি থতমত হয়েই উত্তর দিলাম। এবার যেন একটু পরিষ্কার করে বললাম। বীথির মুখটা ভালো না লেগে তো উপায় নেই।
—’জ্বি ভালো লাগে।’
আচ্ছা শোনো বাবা আসল কথা বলি। আমরা বীথির বিয়ের কথা চিন্তা করেছি। ওর আম্মুর তোমাকে পছন্দ। ওর আব্বুরও দ্বিমত নেই। এখন তোমার মতামত পেলেই শুরু করা যেতে পারে। আর হ্যাঁ, চাকরি। চাকরি একটা বিষয় বটে। তুমি আগামী মাসে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে জয়েন করতে পারবা। শুরুতে যে বেতন পাবা, তোমরা দুজন সুন্দর একতা বাসা ভাড়া নিয়ে সংসার শুরু করতে পারবা। এই বিষয়টা গুছিয়ে এনেই আমরা আলাপ শুরু করেছি। এ মাসেই আমরা শেষ করতে চাই সব আয়োজন। নীতুর আম্মু এবার কথা বললেন,
—’আসলে তোমার কাছে মাস তিনেক আগে আমরা যে সিভিটা নিয়েছিলাম, এটা মূলত তোমার চাকরির জন্যই। গত সপ্তাহে কনফার্ম হয়েছে।’

বেশ ভালো পরিকল্পনা। দীর্ঘমেয়াদী এই পরিকল্পনা সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। না জেনেও ভালো হয়েছে অবশ্য। সারপ্রাইজড বলতে ব্যাপারগুলো যদি লাইফে না থাকে তাহলে তো লাইফ পানসে।
নীতুদের বাড়ি থেকে বের হয়ে কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মতো লাগলো। না কোনো ভয় না। বুকের মধ্যে একটা আকুলিবিকুলি টাইপের। মালিবাগ না গিয়ে শহীদবাগ মসজিদের গলি দিয়ে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের নিচের দিকে চলে এলাম। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। বীথি বেশ সুন্দর মেয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। বলতে গেলে আমার তাকে বেশ ভালোই পছন্দ ছিল। মিলির পরে কোনও ছুঁয়ে যাওয়া মুখ।
হাঁটতে হাঁটতেই মা’কে ফোন দেই। মায়ের দ্বিমত নেই। বিয়ে করে ফেলতে বলে আমাকে। মা আসতে পারবে না নাকি। বড়ভাই তাঁর স্ত্রীসহ থাকে শরীয়তপুরে। ওষুধ কম্পানিতে চাকরি করে। জানি না আসতে পারবে কি না। আর তাকে বলাটাও ঠিক হবে কি না সেটাও ভাবার বিষয়। নিজের সংসার নিয়ে এমন ভাবেই সে ব্যস্ত হয়ে গেল যে এক ভাই ইউনিভার্সিটিতে পরে তার দায়িত্ব নেওয়ার বিন্দুমাত্র তাগিদ অনুভব করেনি। বেশ আনন্দ জাগানিয়া খবর।

অনেককেই বলতে ইচ্ছে করছে। তালতলা মার্কেটের নিচে এসে ৪০টাকার হালিম অর্ডার করলাম। বিয়ের কিছুদিন সেখানেই থাকতে হবে। পরের মাসে চাইলে আমরা বাসা চেঞ্জ করতে পারবো। সেটা বিষয় না। এই অনাত্মীয় শহরে এতোটুকুতেই সম্মান বিসর্জন যায় না। খুব বেশি হলে আমরা বিশ দিন থাকবো। এই নিয়ে বীথির সাথে কথা বলে নিতে হবে। আচ্ছা এতোকিছু ঘটলো কীভাবে? বীথি কি আগ্রহ দেখিয়েছে? হতে পারে। তার চোখ-মুখ অন্তত তাই বলতো। আমাকে পান খাইয়ে… কি হাস্যকর চিন্তা মাথায় আসে। হলে ফিরবো। হেঁটে হেঁটে মালিবাগ রেলগেট যেতে হবে আগে।

তারিখ নির্ধারণ হয়েছিল ২১ বৈশাখ। মানে আজ। শামীম শুধু জানিয়েছিলাম বিষয়টা। সকালে ফোন নিয়ে শামীমকে ফোন দিতে গিয়েই মেসেজটা দেখলাম— Vaia, apnake amar valolagto, valo na lagar kono karon nei. Kintu amar ekta afair chilo. Tar sathe goto rate basa theke paliyechi. sorry, kichu mone korben na.bithy

ফোনটা পকেটে রাখতে রাখতে মনে হলো— বীথি সম্ভবত অ্যাফেয়ার বানানটা ভুল করেছে।

আরও পড়ুন

সর্বাধিক পঠিত