শরীর

শরীর

প্রথম পক্ষের স্ত্রীর মৃত্যুর বত্রিশ দিনের মাথায় শুভ বিবাহটি সম্পন্ন করে ফেলল সত্তর বছর বয়সের সেকান্দার আলি মিয়া। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, তার যেন আর তর সইছিল না। মৃত্যুর চল্লিশ দিনের মধ্যে বিয়ে না করলে নাকি পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে বিয়ে করা যায়না। তাই এত তড়িঘড়ি। হাজার হলেও সমাজ মানে সেকান্দার মিয়া। তাই কোনো রিস্ক নিল না। দুই বছর বেশি দেরি হয়ে যাবে বলে বত্রিশ দিনের মাথায় বিয়েটা সেরে ফেলল। মৃত স্ত্রী গুলশান আরার তিন ভরি ওজনের বালা আর দুই ভরি ওজনের চেইন পরিয়ে নতুন বৌ ঘরে তুললো। বউয়ের সাথে অবশ্য পাঁচ বছরের একটা কন্যাও ফ্রি পেলো সেকান্দার আলি। পাত্রী খুঁজতে অনেক লোক লাগিয়েছিল সে। কোনোটাই ঠিক মনঃপূত হচ্ছিল না। গরীব ঘরের অবিবাহিত মেয়ে ছিল তার পছন্দের তালিকার ওপরের দিকে। সেদিকে বিশেষ সুবিধা করতে না পেরে পছন্দে ছাড় দিতে হয়েছিল। চাইছিল, সন্তানহীন কোনো বিধবা। এরকম কয়েকজন যে পায়নি তা নয়। কিন্তু তাদের বয়সটা আবার চল্লিশের কাছাকাছি। এতে সেকান্দার আলির ঘোর আপত্তি। আর যাই হোক, ঐ একটা ব্যাপারে কোনো ছাড় দিতে চায় না সে। তার পছন্দ কচি মেয়ে। পঁচিশ বা ত্রিশ হলে তা-ও চালিয়ে নেয়া যায়। শেষ পর্যন্তঅনেক যাচাই-বাছাই শেষে ফাতেমা খাতুনকে ঘরে তুললো সেকান্দার আলি। ফাতেমা খাতুনের পরিবার একেবারে সহায়-সম্বলহীন। ফাতেমার মেয়ে ফুলির যখন দুইবছর বয়স তখন তার স্বামী বাদশা মিয়ার মৃত্যু হয়। জায়গাজমি সংক্রান্ত ঝগড়াবিবাদে শত্রুপক্ষের হাতে খুন হয় বাদশা। আহা, জোয়ান মরদ ছিল বাদশা। গা-গতরও ছিল শক্ত-পোক্ত। পেটের জ্বালায় ঠিকঠাক শোক করবার ফুরসতটুকুও পায়নি ফাতেমা। মৃত্যুর পরের দিন থেকেই বুড়ো বাবা আর মেয়ের মুখের খাবার যোগাড় করতে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ শুরু করে। তার উপর রাত বাড়লেই টিনের চালে ঢিলের আওয়াজ। ভাঙ্গাচোরা ঘরে কেউ এসে ঢুকে পড়লে কী করে ঠেকাবে তার বুড়ো বাপ? ভাই একটা থেকেও না থাকার মত। চুরি, ডাকাতির অভিযোগে বছরের ছয় মাসই থাকে কারাগারে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাদশার মৃত্যু ফাতেমাকে যেমন স্তম্ভিত করে দিয়েছিল, তেমনি মানসিকভাবে সাহসী আর শক্তিশালী করে তুলেছিল।

আধপেট খেয়ে, ধুঁকে ধুঁকে জীবনটা যখন আর চলছিল না ঠিক তখনই বিয়ের এই সম্বন্ধটা যেন আলোর ঝলকানি নিয়ে এল। সেকান্দার আলি বয়সে ফাতেমার বাবার প্রায় দশ বছরের বড় হলেও বুড়োর জায়গা-সম্পত্তি অঢেল। ছয় সন্তানের সবাই বিবাহিত। সবাই শহরে থাকে। এমন নির্ঝঞ্ঝাট সম্বন্ধ আর আসেনি। তাছাড়া সেকান্দার আলি তার বাবা আর ফুলির ভরণপোষণের দায়িত্বও নিবে বলে কথা দিয়েছে। এর চেয়ে ভালো বিয়ের প্রস্তাব আর কিছুতেই হতে পারে না। তার প্রথম স্বামীর একমাত্র স্মৃতি ফুলি তার চোখের মণি। দু’একটা সম্বন্ধ যা এসেছিল তারা কেউ ফুলিকে সাথে রাখতে রাজি হয়নি। ফাতেমা তাই ফিরিয়ে দিয়েছিল সেসব প্রস্তাব। ফাতেমার বাবা সেকান্দার আলির বয়সের কারণে একটু খুঁতখুঁত করলেও ফাতেমা প্রস্তাবটি লুফে নিল। ফাতেমার শারীরিক গঠন দেখেই পছন্দ করে সেকান্দার আলি। সন্তানের মা হয়েও ফাতেমার শরীরের বাঁধুনি এখনও বেশ আকর্ষণীয়। সেকান্দার আলির প্রথম স্ত্রী গুলশান আরা তো মরার বহু আগেই মরে গিয়েছিল। বড় মুশকিলের মধ্যে ছিল সেকান্দার আলি। শেষ বিশটা বছর ধরে শুধু কোঁকানি, কাতরানি কাহাতক আর ভালো লাগে! আজ এই ডাক্তার, কাল ওই ডাক্তার, গায়ে ব্যথা, গিঁটে ব্যথা – রীতিমত অসহ্য ঠেকছিল সেকান্দার আলির। গুলশান আরাকে যে কম ভালোবাসতো তা নয়। কিন্তু বুড়ো বয়সে একটু মৌজ-মাস্তি করতে না পারলে কী হয়? গুলশান আরার দিনের শুরু আর শেষ হতো ইবাদত-বন্দেগি করে। সেকান্দার আলি একটু হাত বাড়ালেই ভীষণ রেগে যেত গুলশান আরা। বুড়ো বয়সে ভীমরতি হয়েছে বলেও গালাগাল করতো। নাতি-নাতনিরা বড় হয়েছে, আল্লাহ-খোদার নাম নেয়ার উপদেশ ছাড়া গত বিশ বছর গুলশান আরার কাছ থেকে আর কিছুই পায়নি সেকান্দার আলি। আহা! সেকান্দার আলি কী আর নামাজ-রোজা করেন না? সবটাই করেন। ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি বড় হলে তার জীবনটা পানসে করে ফেলতে হবে বলে কোন কথা আছে? স্ত্রীর সাথে এ ব্যাপারে একমত হতে পারতো না সেকান্দার আলি। নতুন শরীরের খোঁজে তার চোখ দুটো সবসময় চকচক করতো। মেয়েমানুষের শরীর খুব বেশি তাড়াতাড়ি পুরোনো হয়ে যায় বলে ধারণা তার। চল্লিশ পার হলেই যৌবন শেষ। এই দুঃখে সবসময় উসখুস করতো সেকান্দার আলি। গুলশান আরা বেঁচে থাকতেই দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভেবেছিল কয়েকবার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারেনি। যাক, আল্লাহপাক যা করেন ভালোর জন্যেই করেন। গুলশান আরার মৃত্যুতে তাই মনে মনে খুশিই হয়েছিল সেকান্দার আলি। বাইরে বাইরে দুঃখী দুঃখী অভিনয় করতে বেশ কষ্টই হচ্ছিল তার। স্ত্রীর কুলখানি যেতেই গা-ঝাড়া দিয়ে উঠলো সেকান্দার আলি। নাহ, আর দেরি করা যায় না। শীঘ্রই বিয়ের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। চল্লিশ দিনের মধ্যে না হলে আবার সেই দুই বছরের মারপ্যাঁচে পড়ে জীবনের দু’দুটি বসন্ত নষ্ট হয়ে যাবে। সেকান্দার আলির চার ছেলে দুই মেয়ে। মেয়েগুলোর জামাই একেকটা বদের হাড্ডি। সবগুলো বেশি কথা বলতে ওস্তাদ। সবার নজর যে সেকান্দার আলির সম্পত্তির দিকে তা বেশ ভালো করেই জানা আছে তার। তবে ছোট মেয়ের জামাই মামুন আবার তার বিয়ে-সংক্রান্ত কষ্টগুলো বোঝে। বিয়ের ব্যাপারে শ্বশুরকে তালও দেয়। এত বড় বাড়ি খাঁ-খাঁ করে, বউ না আনলে সেকান্দার আলিকে দেখবে কে? ঘরোয়া মিটিং-এ এসব কথা বলে সবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে আর আড়চোখে সেকান্দার আলির মুখটাও একটু দেখে নেয় মামুন। সেকান্দার আলিও তার ধবধবে সাদা দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে সবার সমর্থনের আশায় মুখটা আমসি বানিয়ে রাখে। তার চামড়া কুঁচকানো, গাল-ভাঙা মুখটা আরো লম্বাটে দেখায়। মফিজের কথায় খুশি হলেও তার দুরভিসন্ধি বুঝতে কষ্ট হয় না সেকান্দার আলির। মামুন যেমন লোভী তেমনই কৃপণ। নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝে না সে। সবাইকে হাড়ে হাড়ে চেনা আছে তার। সেকান্দার আলির দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারে ছেলেমেয়েরা কেউ রাজি নয় তা বোঝে সে। ছেলেরা মুখে কিছু না বললেও মেয়েরা এর বিরোধিতা করে। তবে সেকান্দার আলি যে কারো মতামতের তোয়াক্কা করবে না তা-ও সবাই ভালো করেই জানে। যে যা-ই বলুক সেকান্দার আলি নিজের মতোই চলবে। আল্লাহর রহমতে তাকে কোনদিন কারো কাছে হাত পাততে হয়নি। এমনকি ছেলেদের কাছেও না। সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল একজন মানুষ সে। এখনও ধান-চালের দিনে তার বাড়িতে ১৫-২০ জন মানুষ কামলা খাটে। দুই-দুইটা গোলা-ভর্তি ধান থাকে। দুধেল গাইও বর্গা দিয়েছে তিনটি। ৪টি পুকুর ভরা মাছ। ভিটের চারপাশে অনেক দূর পর্যন্ত নানাজাতের ফল-ফলাদির গাছ। কোন কিছুর অভাব নেই সেকান্দার আলির, মাশাআল্লাহ। সারাজীবন নিজের বুদ্ধি আর পরিশ্রমে একে একে গড়ে তুলেছে সব। কখনও কারো মুখাপেক্ষী হতে হয়নি। ছেলেরা প্রায়ই তাকে তাদের সাথে শহরে থাকার জন্যে পীড়াপীড়ি করে। কিন্তু ভিটেমাটি সহায়-সম্পদ ফেলে কোথাও যেতে মন সায় দেয় না সেকান্দার আলির। চারপাশে পাকা দেয়াল তুলে উপরে টিন দিয়ে ছয় কামরার প্রশস্ত বাড়ি তার। বাথরুম আর কলঘরও পাকা। আর্থিকভাবে গ্রামের পরিসরে বেশ ঈর্ষনীয় পর্যায়েই আছে সেকান্দার আলি। তার মত মানুষের দ্বিতীয় বিয়ের জন্য মেয়ে পাওয়া যাবে না এটা কিছুতেই মানতে পারে না সে। তার ছেলেমেয়েরাও ভালো করেই জানে বিয়ের ব্যাপারে তারা যতই বাগড়া দিক না কেনো সেকান্দার আলি তার খায়েশ মিটিয়েই ছাড়বে। সেকান্দার আলির বিয়ের কেনাকাটা সে নিজেই করলো। জামা-জুতোর পেছনে অহেতুক খরচ করার মানুষ সে না। আজকালকার ছেলেমেয়েরা এ ব্যাপারটা একদম বুঝতে চায় না বলে আফসোস হয় সেকান্দার আলির। আরে, বয়স থাকতেই তো পয়সা জমাতে হবে। কাপড়-চোপড়ে এত পয়সা নষ্ট করার দরকারটা কি? নতুন কেনা ঘি-রঙের টেট্রনের পাঞ্জাবি, সাদা ঢোলা পায়জামা আর আগের কেনা স্যান্ডেল পরে নওশা সাজে সত্তর বছরের সেকান্দার আলি। ফাতেমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে যায়। কার্তিকের শেষ। হালকা কুয়াশার রেখা রয়েছে দিগন্ত জুড়ে। আগমনী শীত আর নতুন বউয়ের উষ্ণতার কথা ভাবতেই সুখানুভূতির ঢেউ খেলে যায় শরীর-মন জুড়ে।

মায়ের বিয়েতে ফুলিও নতুন ফ্রক আর জুতো পেয়েছে। লাল টুকটুকে ফ্রকটা পেয়ে দারুণ খুশি সে। নানার মত বুড়ো আর দাড়িওয়ালা বলে সেকান্দার আলিকে বারবার নানা ডেকে ফেলছিল ফুলি। শেখানো সত্ত্বেও ফুলির মুখে বাবা ডাকটি আসছিল না। সেকান্দার আলি অবশ্য এসব খুব একটা আমলে নেয় না।

বিয়ে যা-ই হোক, যেমনই হোক নিজেকে নির্ভার মনে হচ্ছে ফাতেমার। বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিল সে। শরীরেও আর কুলোচ্ছিল না। তবে প্রচুর পরিশ্রম আর আধপেটা খেয়েও তার শরীরের বাঁধনটা অটুট রয়েছে। সৃষ্টিকর্তা তাকে এতটুকু করুণা করেছিল বলেই আজ সে ধনী সেকান্দার আলির স্ত্রী। সেকান্দার আলির আবার ওই একটাই চাহিদা কিনা!

দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত জীবনের সমাপ্তি ভেবে নিয়ে প্রশান্তিতে হঠাৎ খুব ঘুম পেলো ফাতেমার। কিন্তু ঘুমোনো তো দূরে থাক এই মুহূর্তে একটু বিশ্রাম নেয়াও অকল্পনীয়। নতুন বউ দেখতে আশাপাশের বৌ-ঝিদের ঢল নেমেছে। নতুন বউ দেখা গ্রাম্য বিনোদনের অন্যতম একটি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বিস্মিত। একমাস আগে যেখান থেকে সাদা কাফন পরা লাশ বেরোতে দেখেছে আজ সে ঘরে লাল শাড়িতে গয়না পরা বউ! বয়স বাড়তে থাকলে মানুষের মুগ্ধ আর বিস্মিত হবার ক্ষমতা কমতে থাকে বলে বড় বড় মানুষগুলো ছোটদের মত বিস্মিত হলো না। ছোট মেয়ের জামাই ছাড়া অন্য ছেলেমেয়েরা কেউ বাবার বিয়েতে আসেনি। তাতে অবশ্য সেকান্দার আলিকে মোটেও বিচলিত দেখায় না। বরং স্বস্তিবোধ হয়।

সারাদিনের ক্লান্তিতে ফুলি ঘুমিয়ে পড়লে পাশের রুমে শুইয়ে দেয়া হল। কাপড় পাল্টে শোবার রুমে ঢুকলো ফাতেমা আর সেকান্দার আলি। ঝিঁঝিঁর রহস্যময় ডাকে সন্ধ্যারাতেই গভীর রাত্রির অনুভব হচ্ছিল । নীরবতা ভাঙে সেকান্দার আলি। মোলায়েম কণ্ঠে ফাতেমাকে কাছে ডাকে। ‘আমার কোনো অন্তর-বন্ধু নাই, বউ। তুমি আমার পরান-বন্ধু হবা?’ উত্তর না দিয়ে বুড়োর মুখের দিকে তাকায় ফাতেমা। ‘বুঝলা ফাতেমা, বহুত দিন থাইকা আমি একলা। সব থাকবার পরেও কী জানি কী নাই আমার! আমি তোমারে সব দিমু, বাড়িঘর, জায়গা-সম্পদ সবকিছু। তুমি শুধু আমারে কিছু সঙ্গ দিয়ো। অন্তর-মাখান সঙ্গ। তুমি শুধু তোমারে দিয়ো’। ফাতেমার হাতদুটো হাতের মুঠোয় নেয় সেকান্দার আলি। ‘দাও বউ, শরীরটা একটু টিপ্যা দাও’। যুবতী হাতের স্পর্শে আবেশে চোখ বুজে আসে সেকান্দার আলির। আহা, কতটা দিন সে এরকম স্পর্শ থেকে বঞ্চিত। তার আবার এসবের প্রতি লালসা একটু বেশি। নিজের কামনা চরিতার্থে যে বিভিন্ন কিশোরীদের শরীরে, বুকে অতি সতর্কতায় হাত বুলোয়নি তা নয়। কিন্তু তাতে কী আর তৃপ্তি মেলে? তার উপর আছে জানাজানি হবার ভয়। গ্রামের মানুষের জায়গাজমি, মামলামোকদ্দমা, সালিশ সংক্রান্ত কাজ দেখভাল করে সমস্যা সমাধানের কাজে সুনাম থাকায় গ্রাম্যসমাজে আলাদা একটা অবস্থান রয়েছে তার। বদনামের আশংকায় নিজেকে বহুকষ্টে নিবৃত্ত করতো সেকান্দার আলি। কিন্তু মাঝে মাঝে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতো। যাক, এখন আর সেই ভয় নেই। ঘরে তার যুবতী বউ।

নতুন বউয়ের ছোঁয়ায় ঘর-দুয়ার আবার ঝকঝকে আর পরিপাটি হয়ে উঠল সেকান্দার আলির। ঘরের দাওয়ায় বসে যুবতী বউয়ের কাজকর্ম দেখে আর সুখের আবেশে মগ্ন হয়। নিজেকে তার পঁচিশ বছরের যুবক বলে মনে হয়। সে যেন ফিরে যায় তার সংসার জীবনের প্রথম দিনগুলোতে। গুলশান আরার শরীর-স্বাস্থ্যও ভালো ছিল মাশাআল্লাহ! কিন্তু তার লাগামহীন কামনাবাসনায় কেন যেন কখনই পরিপূর্ণভাবে সাড়া দিত না গুলশান আরা। বিয়ের ছয় বছরের মধ্যে তিন সন্তানের মা হয়ে আরো বেশি গুটিয়ে ফেলল নিজেকে। তবে মনটা খুব ভালো ছিল গুলশান আরার। ধর্মে-কর্মেও ছিল নিবেদিত প্রাণ। তবু, শুধু মন দিয়ে কী আর প্রাণ ভরে! শরীরও যে লাগে!

সেকান্দার আলির দিকে ডাবের পানি বাড়িয়ে দিতেই সম্বিৎ ফিরে পায়। গ্লাসটা নেবার সময় ফাতেমার হাতটা একটু চেপে ধরে। বউটা তার ভালোই যত্ন-আত্তি করছে। শরীরটাও বেশ ঝরঝরে লাগছে ইদানীং। ডাবের পানি খেতে খেতে ফাতেমাকে দেখে সেকান্দার আলি। উঠোন ঝাড় দিতে দিতে সামনে একটু ঝুঁকতেই শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে ফাতেমার ভরাট সুডৌল বুক যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়। শুকনো পাতাগুলো উঠোনের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে জড়ো করতে গিয়ে সেকান্দার আলির দিকে পেছন ফেরে। সরু কোমরের নিচে ভারী মাংসল নিতম্বের ওপর কাপড়টা আঁটসাঁট হয়ে বসেছে। বারোহাতের শাড়িটি যৌবন ধরে রাখতে যেন পুরোপুরি ব্যর্থ। উঠোনের অদূরেই মাটির চুলায় রান্না বসিয়েছে ফাতেমা। শুকনো পাতা দিয়ে চুলোর জ্বালটা উসকে দিল খানিকটা। কমলা তাপে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ফাতেমার মুখে। আহা শরীর! মেয়েমানুষের শরীর! সেকান্দার আলির বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। অনেক দিনের ছাইচাপা আগুন যেনো উসকানি পেয়ে লকলক করে! কিসের শৈশব শৈশব করে মানুষ! শৈশব নয়, যৌবনই জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। সবচাইতে আকাঙ্ক্ষিত সময়।

কথায় আছে, ‘পেটের চিন্তা গেলে নাকি স্বপ্ন দেখতে শুরু করে মানুষ’। ইতোমধ্যে ফাতেমা ভালোভাবে বুঝে গেছে বুড়োর অঢেল সম্পত্তি। স্বার্থচিন্তা পেয়ে বসে তাকে। সেকান্দার আলির একটা সন্তান গর্ভে ধরতে ব্যাকুল হয়ে পড়ে সে। একটা ছেলে সন্তান হলে কিছুটা চিন্তামুক্ত হত সে। কখন না কখন পটল তোলে বুড়ো। তখন সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারায় কতটুকুই বা পাবে সে? সেকান্দার আলির প্রথম ঘরের সন্তানেরা তাকে ঠিক মন থেকে গ্রহণ করতে পারেনি। তার সাথে একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলে তা বেশ বুঝতে পারে ফাতেমা। এরকম অবস্থায় তার আর ফুলির ভবিষ্যত চিন্তা কাতর করে তোলে তাকে। চার ছেলের মধ্যে তিন ছেলের অবস্থা বেশ ভালো। শুধু সেজো ছেলে ইলিয়াসের অবস্থা তেমন একটা ভালো নয়। দীর্ঘদিন সৌদিআরবে থেকে দেশে ফিরেছে সম্প্রতি। দোকানের ব্যবসা করতে গিয়ে অনেক টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দেশে ফিরেছে। ধার-দেনাও হয়েছে বিস্তর। ইদানীং প্রায়ই বাবার কাছে আসছে। তার ব্যাপারে সাহায্যের প্রত্যাশায়। বাবা যদি তার কিছু জায়গাজমি বিক্রি করে তাকে কিছু টাকাপয়সা দিয়ে বিপদ থেকে উদ্ধার করে। বউ, ছেলেমেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে আছে সে। সেকান্দার আলি এসব ব্যাপারে খুব সতর্ক। তার হিসেবী মনোভাবের কথাও সবাই জানে। আর যাই হোক, বেঁচে থাকা পর্যন্ত তার সম্পত্তিতে হাত দিতে দেবে না কাউকে। কিছুতেই না। ধান-চালের দিনে ইলিয়াস এসে দুই/তিন বস্তা চাল নিয়ে যায়। ব্যাপারটা একদম সহ্য হয় না ফাতেমার। তার আর ফুলির ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে হয় তাকে। গোপনে গরুর দুধ, হাঁসমুরগির ডিম বিক্রি করে টাকা জমায় সে। সংসার খরচের টাকা থেকে প্রতিমাসে সরিয়ে রাখে কিছু। বুড়ো দু’চোখ মুদলে তার অবস্থা কী হতে পারে ভেবে এখন থেকেই সতর্ক হয়ে যায় সে। দুনিয়াটা হচ্ছে বুদ্ধি খাটিয়ে চলার জায়গা। বোকাদের কোনো জায়গা নেই এখানে। সেজো ছেলেটা বাপের কাছে সাহায্যের জন্যে এলেও বুদ্ধিশুদ্ধি একটু কম বলেই মনে হয় ফাতেমার। বিচক্ষণতার সাথে ব্যাপারটা সামাল দেয় ফাতেমা। অন্যান্য ছেলেমেয়েরাও চায় কিছু জমি বিক্রি করে সেকান্দার আলি ইলিয়াসের আয় রোজগারের একটা ব্যবস্থা করে দিক। কিন্তু ফাতেমা মানতে পারেনা এটা। বাড়তি আদর-যত্ন আর সোহাগ আহ্লাদ করে বুড়োকে একদম নিজের বশে নিয়ে নিয়েছে সে। সেকান্দার আলি যাতে জমি বিক্রিতে রাজি না হয় সেজন্যেও অনেক বুঝিয়েছে। সেকান্দার আলিও ফাতেমার পরামর্শই মেনেছে। যেভাবে চলছে সেভাবেই চলতে থাকে শেষমেশ।

দিন গড়িয়ে মাস যায়। মাস গড়িয়ে বছর। ফাতেমার শরীরটা বিরোধিতা করে বসে মাঝে মাঝে। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এক প্রতিবেশীর পরামর্শে মোরগের অণ্ডকোষ আর চড়াই পাখির মাংসও রেঁধে খাইয়েছেন সেকান্দার আলিকে। তবু কিছুতেই কিছু হয় না। মৃত স্বামীর কথা প্রায়ই মনে হয়। প্রতি রাতে বুড়ো যখন অশীতিপর হাতে ফাতেমাকে ছোঁয়, বিতৃষ্ণায় বিষিয়ে ওঠে শরীর-মন। প্রথম স্বামীর শক্ত-সমর্থ যুবক শরীরটা চোখে ভাসে। আহা, বড় সৌন্দর্য ছিল তার স্বামীর। শরীরটাও ছিল চমৎকার। ফাতেমাকে পাগলের মত ভালোবাসতো বাদশা। বুড়োর নরম চামড়ার হাড়-জিরজিরে বুকে মুখ গুজে মৃত স্বামীর সোহাগের ভাবনায় কাটিয়ে দেয় সারারাত। সারাদিন কাজেকর্মে কেটে গেলেও রাত্রিতে সেকান্দার আলির স্পর্শের কথা ভাবলেই গা গুলিয়ে ওঠে ফাতেমার। সবই তার নিয়তি। ‘কপালের লিখন, না যায় খণ্ডন’।

দেখতে দেখতে পনের বছরে পা দেয় ফুলি। গ্রামের দু’একজন বিয়ের সম্বন্ধও নিয়ে আসে। ফাতেমাও চায় বুড়ো বেঁচে থাকতে থাকতে ফুলির একটা গতি হয়ে যাক। বুড়োর বয়সও আশি পেরিয়েছে। ভালো ঘরদোর দেখে ফুলির বিয়েটাও হয়ে যায় একসময়। সেজো ছেলের গ্রামের বাড়ি আসা যাওয়া অব্যাহত থাকে। বাদবাকি ছেলেমেয়েরা তেমন একটা খোঁজখবর নেয় না সেকান্দার আলির। বুড়োর শরীর হাড্ডি-চর্মসার হলেও অসুখ-বিসুখ কিছু নেই। বয়স হিসেবে বেশ তরতাজা এখনও। বাড়তি কিছু খরচাপাতি করে ইলেকট্রিক লাইন এনে রঙিন একটা টেলিভিশন কিনে ফেলে সেকান্দার আলি। বেঁচে থাকাটা সুখের মনে হয় তার। এখনও কয়েক মাইল হেঁটে বাজারে গিয়ে চায়ের দোকানে বসে গ্রামের মুরুব্বীদের সাথে আড্ডা দেয়, পত্রিকা পড়ে। তবে ইদানীং শীতকাল এলেই একটু কাহিল হয়ে পড়ে। বিড়ির নেশার কারণে কাশিটাও ভোগায় বছরে দু’একবার। এখন আর আগের মত জোর পায় না। সেজো ছেলেটা টুকটাক ব্যবসা করলেও সুবিধা করতে পারে না খুব একটা। যেখানে হাত দেয় সেখানেই শুধু লস।

ফুলির বিয়ে হয়ে গেলে ফাতেমা একদম একা হয়ে যায়। তার প্রথম স্বামীর একমাত্র স্মৃতি ওই মেয়েটা। পেছনের দিকে চেয়ে বুক ভেঙ্গে দীর্ঘশ্বাস আসে ফাতেমার। তবে তার জমানো টাকার পরিমাণ তাকে খুব বেশি দুঃখী হতে দেয় না। মাঝে মাঝেই সে গোপন বাক্সটা খুলে টাকাগুলো গুণে রাখে। প্রচণ্ড সুখানুভব হয়। আজকাল বুড়ো একটু নরম হয়ে যাওয়াতে টাকা সরাতে আরো বেশি সুবিধা হয়। মনে মনে বুড়োর আয়ু বৃদ্ধির জন্য দোয়া করে তবু। বুড়োটা বেঁচে থাকুক। বটবৃক্ষের ছায়ায় আছে সে। মরে গেলে কিছুটা হলেও বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে তাকে। অবশ্য এই দশ বছরে সে শুধু অর্থই নয় শক্তি আর সাহসও সঞ্চয় করেছে। প্রথম দিকে অনেক কয়টা বছর অপাংক্তেয়র মত কাটিয়েছে এই সংসারে। কারুর কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। নানাজনের নানা কটুকথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু স্বার্থরক্ষায় বরাবরই অবিচল ছিল সে। এখন নিজের একটা অবস্থান করে নিয়েছে।

মাঘ মাসের এক রাতে শ্বাসকষ্ট উঠল সেকান্দার আলির। গত কয়েকবছর ধরেই এমনটা হচ্ছিল। কিন্তু এবার ফাতেমার মনে একটু ‘কু’ ডাক দিল। শেষ রক্ষা বুঝি হবে না এবার! বাবার অসুখের খবর পেয়ে ছুটে এল সবাই। শহরে নেবার সুযোগ হলো না আর। ভোররাতের দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো সেকান্দার আলি মিয়া। সেই সাথে অবসান ঘটে সেকান্দার মিয়ার একাশি বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের! ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!

সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে প্রথম স্ত্রী গুলশান আরার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন সেকান্দার আলি। সমাপ্ত হলো বাঁচার এবং যাপনের জন্য আকুল এক জীবনের। সবার মুখে মুখে আলোচিত হলো তার কর্মমুখর জীবনী। শূন্য থেকে শুরু করে বুদ্ধি, বিচক্ষণতা আর কর্ম দিয়ে কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজহাতে গড়ে তুলেছিলেন নিজের জীবন। বুড়ো বয়সে যুবতী মেয়ে বিয়ে করে সমালোচনার মুখে পড়লেও পরবর্তীতে তা সামলে নিতে পেরেছিলেন সেকান্দার আলি। সবাই একবাক্যে স্বীকার করলো, বড় আধুনিকমনা ছিলেন সেকান্দার আলি। শেষ দিন পর্যন্ত পত্রিকা পড়া, বই পড়া, দেশ-বিদেশের খবরাখবর রাখার প্রতি ঝোঁক ছিল অটুট।

অন্যান্য ভাইয়েরা টাকাপয়সা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলেও সেজো ছেলে ইলিয়াস সকল আনুষ্ঠানিকতার তদারকি করলো আন্তরিকতার সাথে। কুলখানি আর চল্লিশাতে গরীব-দুঃস্থদের খাওয়ানো হলো। মিলাদ পড়ানো হলো। সেকান্দার আলির মৃত্যুর পর তার জায়গা-সম্পত্তির নথিপত্র পাওয়া গেল। অনেক আগেই সে ভাগবাটোয়ারাগুলো সুচারুরূপে সম্পন্ন করে রেখেছে। যার যা পাওনা সেভাবেই বণ্টন করে গেছে। সেকান্দার আলির দূরদর্শিতা আবারও প্রশংসিত হল। ফাতেমা খাতুন শক্ত হাতে সংসারের সমস্তকিছু দেখভাল করতে লাগলেন। সেজো ছেলে ইলিয়াস আর মাঝেমধ্যে ছোট মেয়ের জামাই মামুন ছাড়া আর কেউ যে আসবে না এটা জানে ফাতেমা। ইলিয়াসের আর্থিক প্রয়োজনের ব্যাপারটাও বোঝে। এদিকে ফাতেমারও একটা সাপোর্ট দরকার। ইলিয়াসকে কবজা করতে বেগ পেতে হয় না ফাতেমার। সেজো ছেলের গ্রামে আসা যাওয়াও বেড়ে যায়। ফাতেমার পরামর্শেই ঠিক হলো স্থায়ী রোজগারের জন্য তারা দুজনে মিলে ব্যবসা করবে। কিছু জমি ব্যাংকে মর্টগেজ দিয়ে ঋণ নিয়ে বাড়ির কাছেই দুটো দোকানঘর তৈরি শুরু হল। সবধরনের নিত্য প্রয়োজনীয় মালামাল রাখবে বলে ভাবল। এতে গ্রামের মানুষেরাও সুবিধা পাবে। তিন/চার মাইল পায়ে হেঁটে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাজারে যেতে হবে না। ধীরে ধীরে ইলিয়াস যেনো ফাতেমার আদেশের ক্রীড়নক হয়ে উঠলো। শহর থেকে রোজ আসা যাওয়া করে দোকানটা গুছিয়ে নিলো ইলিয়াস। কিন্তু গ্রামে দোকান করার সিদ্ধান্তটি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না ইলিয়াসের বউ জান্নাত। বহুদিন ধরে শহরে কিছু করবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হতে হতে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল ইলিয়াস। একটু আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় অনেক দিন ধরে সংগ্রাম করে চলেছে। জান্নাতকে অনেক বোঝাল ইলিয়াস। কিন্তু জান্নাত সন্তুষ্ট হতে পারলো না কিছুতেই।

আজই দোকানের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার কথা। কাল থেকে মালামাল তোলা শুরু হবে। খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে আগেই অর্ডার করা আছে। ভালোয় ভালোয় দোকানের কনস্ট্রাকশনটা শেষ হলেই হয়। সন্ধ্যা হয় হয়। কিছু কাজ তবু বাকি থেকে যায়। টানা দু’দিন একেবারে বিশ্রাম ছাড়া খেটেছে মিস্ত্রিরা। শেষমেশ হাল ছেড়ে দেয় ওরা। ‘কাইল সকাল সকাল বাকি কাম করুম’। পরিশ্রান্ত মুখে একথা শুনে ইলিয়াস আর ঘাটায় না। কাজের পাওনা মিটিয়ে দিয়ে খুব সকালে আসতে বলে বিদায় দেয় ওদের। ইলিয়াসেরও শহরে ফিরতে হবে। আজ বেশ দেরি হয়ে গেছে। ভেবেছিল টানা কাজটা করে শেষ করে ফেলবে। কিন্তু হলো না। জান্নাতকেও মোবাইলে জানিয়েছে, তার আসতে দেরি হবে। তবে এতটা দেরি হবে তা ভাবেনি।

সন্ধ্যা ছয়টার পর প্রায়ই ইলেক্ট্রিসিটি থাকে না গ্রামে। কুপি ধরিয়ে এগিয়ে এলো ফাতেমা। ‘আইজ রাইত না গেলে হয় না? সারাটা দিন বহুত পরিশ্রম হইছে, আইজ রাইত থাইকা যাও’। ক্লান্তিতে ইলিয়াসের শরীরটাও ভেঙ্গে আসছিল। ফাতেমার প্রস্তাবে খুশিই হয় সে। আজ না গেলে কাল খুব ভোরে কাজটা শুরু করা যাবে। দুপুরের মধ্যেই কাজটা শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আজ রাতটা তাই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। হাতমুখ ধুয়ে এসে দেখে ফাতেমা তার বাবার ব্যবহৃত লুঙি আর শার্ট সামনের বিছানার উপর বের করে রেখেছে। কাপড় বদলে খেয়ে নিল দুজনেই। খুঁজে পেতে একটা বই হাতে নিয়ে সামনের খাটে শুয়ে পড়লো ইলিয়াস। ফাতেমা হারিক্যান জ্বালিয়ে মাথার কাছের টেবিলে রেখে নিজের রুমে চলে গেল। সারাদিনের ক্লান্তিতে শোয়ামাত্রই ঘুমে তলিয়ে গেল ইলিয়াস। ফাতেমা খাতুন বিছানায় কেবল এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। কিছুতেই ঘুম আসছে না ফাতেমার। সেকান্দার আলি মারা যাওয়ার পর থেকে এমনটা হচ্ছে তার। সারারাত জেগে কাটিয়ে দেয়। গোলাঘরের পাশে ধান-চালের কাজ করা এক কর্মচারীকে পরিবারসহ থাকতে দিয়েছে ফাতেমা নিজের নিরাপত্তার খাতিরে। তবু ঘুম হয়না তার। বিছানা থেকে উঠে পুরো ঘরটা হেঁটে বেড়ালো একবার। জমানো টাকার বাক্সটাও দেখে নিল, ঠিকঠাক আছে কি’না! তারপর ধীর পায়ে ইলিয়াসের খাটের পাশে এসে দাঁড়ালো। ঘুমন্ত ইলিয়াসের মুখের দিকে চেয়ে চমকে উঠলো ফাতেমা! একি! এতো তার প্রথম স্বামী বাদশা শুয়ে আছে। নিজেকে আর সামলানোর চেষ্টা করল না। অস্ফুট স্বরে বাদশা, বাদশা বলে ডাকতে ডাকতে শক্ত করে জাপটে ধরলো ইলিয়াসকে!

আরও পড়ুন

সর্বাধিক পঠিত