বেওয়ারিশ

অগ্রাণের কড়া রোদে পিঠ পুড়ে যায় দশা। উঠানের কিনারে একটা আধবুড়া জীর্ণ বড়ই গাছ দাঁড়ায়ে আছে, তার ছায়ায় পিঁড়ি পেতে বসে সন্তানকে মাই খাওয়াচ্ছে রমিজা। উঠানে কাঁচা ধান ছড়ানো, সেই দিকেও তার খেয়াল রাখতে হয় । একবার মুরগীর পাল এসে ধান ঠোকরাতে শুরু করে। রমিজা তখন হাতের কাছে রাখা পাজন তুলে হুইসস শব্দ করে ডেকে উঠে। ডাক শুনে মুরগী লাফিয়ে দূরে সরে যায় তবে কিছু সময় পরে আবার ফিরে আসে। মাই খেতে খেতে শিশুটা হাত-পা নাড়ায়। হাতের সাথে প্যাঁচ লেগে একবার ওড়না সড়ে যেতে লাগলে রমিজা ধমক দেয়, ‘দুরুজা’। একদিকে সন্তান আরেকদিকে মুরগী সামলাতে গিয়ে তার কাছে মনে হয় এদের মাঝে নিশ্চয়ই গোপন কোন যোগাযোগ আছে।

বাড়িতে কেউ নাই; সকালের এই সময়টাতে চারপাশ নীরব থাকে। বুকের ওড়না নামায় রাখে রমিজা। শিশুটা আরও বেশি করে হাত-পা নাড়ায়। একবার হাত গিয়ে রমিজার চোখে লাগলে সে চ্যাচিয়ে উঠে, “হেডাডা আর বালা লাগে না। অইবার পরতিকা জ্বালাইয়া মারতাচে।” দূরে দেখা যায় কে যেন বাড়ির দিকে আসছে। রমিজা ওড়নাটা টেনে তুলে নিয়েও খোদেজাকে দেখে আবার আগের জায়গায় রেখে দেয়। পুরানা শাড়ি আর আধময়লা সোয়েটার গায়ে বাড়ি ফিরে একমনে তবজি জপে খোদেজা। তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি কিন্তু দেখে মনে হয় তারচেয়ে কম। মুখে বয়সের ভাজ পড়েনি কিছু তবে কপালে ছোট করে দাগ দেখা যায়। ঘর থেকে পিঁড়ি বের করে রোদে ভাবলেশহীন হয়ে বসে থাকে সে। রমিজা তারদিকে কয়েকবার ফিরে চায়।

হুদুফু হেরে ইকটু দরো না।

দেকগা গিয়া বাজারো লাশ পইড়া রইচে।

ও আল্লাগো কাইজ্জা লাগচেনিতা? কেডা মরচে?

মাইগ্যো মা, দেইক্যা শইলডা বিজারাদা উরচে।

কিতা অইচে হুফু কও না! কই গেচলা তুমি?

শরিপ্যার মাইয়ার জ্বর উরচে, দেকতো গেচলাম। তাবিজ দিতাম গিয়া রাইতকা হেরার বাইতই আচলাম। আইবার সমো দেইক্যা আইচি।

এই বলে খোদেজা আবার তজবি জপতে থাকে। এমন সময় বাড়ির পাশ দিয়ে কয়েকজন দৌড়ে যায় বাজারের দিকে। সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে লাশের খবর। বাতাসের নীরবতায় মানুষের গুঞ্জন শোনা যায় । আতংক শুরু হয় চারদিকে। একটু পরে বিকট সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি ঢুকে গ্রামে। দূর থেকে শোনা যায় সাইরেনের শব্দ। পুলিশ আসার খবর শুনে যে যার মত পালিয়ে যেতে থাকে। প্রত্যেকে ভাবে পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে যাবে কিন্তু কেন ধরে নিয়ে যাবে তা জানে না কেউ। ছুটে ঘরে ঢুকে রমিজা কাপড় ঠিক করে নেয়।

হুদুফু লওনা হেরে, আমি হের বাফেরে বিলো গিয়া কইয়াই।

বাদইল্যা কিতা অহনো আইচে না বাইত?

সহালে গেচলো, অহনই আইবো। বেডাইত হগলতে বাগতাচে। বাইত ফুলিশ আইবো মনো। তুমি বাইত থাইক্কো আমি কইয়াই।

তুই থাক আমি যাইতাচি।

বিকালে সর্দার বাড়িতে সভা বসে। শাদুর গোষ্ঠি আর লাডুর গোষ্ঠির সর্দার, গ্রামের মুরব্বীরা সহ সকলে একত্র হয়। পুলিশ এসে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ফিরে যায়। পুলিশ যাবার পরে তারা একে একে সর্দার বাড়িতে আসে। একপাশে রমিজা, তার স্বামী বাদল আর খোদেজাকেও দেখা যায়। লাশের কোন ঠিকানা পাওয়া যায়নি তখনও। কেউ জানেনা কোথা থেকে এই লাশ এসেছে আর কারা খালের কাছে এনে মেরে ফেলে গেছে। সর্দাররা একে অন্যকে দোষারোপ করতে থাকে। তিন বছর আগের ঝগড়ার কথা তুলে কেউ। সেইবার গোষ্ঠিতে গোষ্ঠিতে ভাগ হয়ে পুরো গ্রাম জুড়ে মারামারি লেগেছিল। এমনকি আশেপাশের গ্রামের লোকেরা এসেও যোগ দিয়েছিল। এইসব কথা আবার উঠে আসে। একে অন্যকে দোষারোপ করে তারা উত্তেজিত হয়ে পড়ে তখন জটলার ভিতর থেকে কে যেন হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিলে সকলে চুপ হয়ে যায়। রমিজা দেখে রুহুলের বউ মাটিতে বসে বিলাপ করছে। তিন বছর আগে এইখানেই রুহুলের লাশ পড়েছিল। মারামারি চলাকালিন এক মাঝরাতে কারা যেন রুহুলকে একা পেয়ে মেরে ফেলে গিয়েছিল সরিষাক্ষেতের ধারে। কোন গোষ্ঠি স্বীকার করেনি সেই খুনের দায়। আজকের মতই এইভাবে একে অন্যের উপরে দোষ চাপিয়েছিল তারা।

সভায় শেষমেশ সিদ্ধান্ত হয়, গতরাতে যারা বাড়ির বাইরে ছিল তাদের ব্যাপারে ভাল করে খোঁজ নেওয়া হবে। প্রত্যেকে হাত তুলে যার যার কারণ জানায়। রমিজা লক্ষ্য করে খোদেজা তখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি হাতও তুলেনি। সে খোদেজার দিকে ফিরে তাকায়। খোদেজার কোলে তার শিশুটি দুই হাত নাড়িয়ে খেলা করছে। তার মনে পড়ে সকালে বাড়ি ফেরার সময় খোদেজাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। যেন সারারাত ঘুমায়নি এমন লেগেছিল। তখন সে ভীরের মাঝে শরীফকে খোঁজে, কোথাও শরীফকে দেখা যায় না। শরীফের মেয়েকে দেখা যায় এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। সে আবার খোদেজার দিকে চায়। খোদেজার কাছে তার শিশুটি মনের সুখে খেলা করছে।

সভা শেষ হয় কোন সমাধান ছাড়াই। লাশটি কোথাকার আর খোঁজ পাওয়া যায় না। কেউ এসে লাশের আত্মীয় বলেও দাবি করে না তাই গ্রামের গোরস্থানে দাফন করা হয়। বাড়ি ফিরে বিভিন্ন চিন্তা খেলে যায় রমিজার মনে। এদিকে শিশুটি সন্ধ্যার পরে ঘুমিয়ে গেছে। তার পাশে শুয়ে চোখ বুজে থাকে রমিজা। সভায় খোদেজা হাত তুলেনি কেন এইসব ভাবতে ভাবতে তার চোখ লেগে যায়। রাতে বাদল বাড়ি ফেরার পরে সে ভাবে তাকে এই ব্যাপারে সবকিছু খুলে বলবে কিন্তু কিছু না বলে চুপচাপ শুয়ে থাকে শুধু। খাওয়া শেষ করে বাদল রমিজার পাশে এসে শোয়।

আচকা অত চুপচাপ অইয়া রইচো। অসুক করচেনিতা।

নাগো শইল বালা আচে। মরা বেডাডার লাইগা মনডা দরফর করতাচে। কার জামাই না কার বাফ মইরা রইচে আল্লা জানে।

বাজারো গেচলাম সবে এইতাই কইতাচে। আল্লা মাফ করুক, কারা এই কাম করল, কেরে করল। হাইতানা তুমি?

বালা লাগতাচে না। হিদা লাগলে রাইতো উইট্যা হামুনে।

হুদুফু হাইচেনি?

আইচেনি বাইত?

বাত্তি জালাইন দেকচি। আইচে লাগে।

তাইলে মনো হাইতো না।

কথা শেষ হলে বাদল আরও কাছে ঘেঁষে শোয়। রমিজা দুই হাত উঁচু করে দেয়, বাদল পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। তার ঘাড়ে গরম নিশ্বাস লাগে। বাদল আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে ঘাড়ে চুমু দেয়। রমিজা বাদলের দিকে ঘুরে ফিসফিস করে বলে, হুদুফুরে বিয়া দিবানি?

অহন বিয়া করবো কেডা?

গেরামো গেরামো হুজলে জামায় ফাওন যাইবো।

আৎকা বিয়ার কতা কইলা। কোনস্তা অইচেনি?

না, হুফুর লাইগ্যা মায়া লাগে।

আইচ্চা। কালকা হুজ লমুনে” বলে বাদল রমিজাকে নিজের উপরে টেনে তুলে। হারিকেনের অল্প আলোতে পরস্পরের মুখের দিকে চেয়ে থাকে দুইজনে। এমন সময় শিশুটি কাঁদতে শুরু করে। হাত নাড়িয়ে রমিজা তাকে ঘুম পাড়ায়। এরপর নিজেও মাথা ঢেলে দেয় বাদলের বুকের উপরে। কান পেতে শুনে স্বামীর বুকের ঢিপঢিপ শব্দ। এইভাবে শুনতে তার ভাল লাগে। ছোটবেলায় বাবার কোলে এই শব্দ শোনা যেত। বাবার কথা মনে পড়ে তার। বাদলকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠে সে।

ভোরে পুকুর ঘাটে গোসল করতে যেয়ে খোদেজার সাথে দেখা হয়। রমিজা দেখে শীতে থরথর করে কাঁপছে খোদেজা। পুকুরের পানি থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। দুইটা হাঁসের ছানা ভেসে আছে এক কিনারে। রমিজা পানিতে নামার সময় তার সাথে সাথে কয়েকটা ব্যাঙ পানিতে ঝাপিয়ে পড়লে ছপাৎ ছপাৎ শব্দ হয়। দূর মসজিদে আজান পড়ে। পাশের সরিষার ক্ষেত থেকে একটা কুকুর কুওও করে ডাক দেয়।

“আইচকা রাইতেও শরিপ্যার বাইত আচলা?” রস করে জিজ্ঞাসা করে রমিজা। খোদেজা কোন উত্তর না দিয়ে নীরবে ওযু করে।

বিহালো সবাইর সামনে আত তুলচো না কিয়ের লায়গ্গা হুফু? তুমিও তো বাইরে আচলা রাইতে। শরিপ্যার বাইত তাকচো এই কতা কয়লানা।

খোদেজা কোন কিছু বলে না। রমিজা ডুব দিয়ে উঠে দেখে সে চলে যাচ্ছে ঘাট থেকে। সকালে ছোট ছেলে-মেয়েরা আরবি পড়া শেষে খোদেজার ঘর থেকে বের হয়। খোদেজাও বের হয় তাদের সাথে। উঠান থেকে সেটা লক্ষ্য করে রমিজা ডাক দেয়, “হুদুফু, কই যাও? রাইতকাও হাইচো না, হায়া যাও দুইল্লা।” খোদেজা যেন শুনতে পায় না কিছু। বাচ্চাদের সাথে হাঁটতে থাকে। রমিজা ভাবে ইচ্ছা করেই তার ডাক শুনেনি। আরও দূরে এগিয়ে গেলে খোদেজার ঘরে ঢুকে সে। ছোট অন্ধকার ঘরে একটা চৌকি পাতা তাতে কয়েক দশকের পুরনো জীর্ণ কাঁথা বিছানো। চৌকির উপরে একটা রিহালের একপাশে কুরান রাখা অন্যপাশে সিপারা। আরেকটা রিহালে কাইদা রাখা। জানালার পাশে বিশেষ উপায়ে লোহা লাগিয়ে তজবি টানানো আছে। একটা পুরনো প্লাস্টিকের বয়ামে ছোটবড় বিভিন্ন তাবিজ রাখা। এগুলো খোদেজার বানানো পথ্য। গ্রামে কেউ অসুস্থ হলে তার কাছ থেকে এসে তাবিজ নিয়ে যায়। বিনিময়ে কেউ চাল দেয় নাহয় টাকা দেয়।

তিন ভাই আর চার বোনের মাঝে খোদেজা ছিল সবচেয়ে ছোট। মা-বাবা মারা যাবার আগে বোনদের বিয়ে হয়ে যায় তাই ভাইদের কাছে বড় হয় সে। গেরস্ত ঘর দেখে বিয়ে হয়েছিল খোদেজার কিন্তু দুই বছর যেতে না যেতেই শ্বশুর বাড়ি থেকে তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তারপর থেকে আর স্বাভাবিক জীবন যাপন করেনি সে। স্বামীর বাড়ি থেকে আসার কয়েক বছর পরে পাগলামি শুরু হয় তার মাঝে। ছোট শিশু দেখলে অকারণেই হাসতো শুধু, কখনো ছু মেরে টেনে নিয়ে যেত বাপ মায়ের কোল থেকে। সকলে ভাবে জ্বীনে ধরেছে তাকে। হুজুর এসে জ্বীন ছাড়িয়ে দিয়ে যায় তবুও ঠিক হয়নি খোদেজা। এভাবে এক দশক কেটে যায়। ধীরে ধীরে আগের পাগলামি কমতে থাকে, তার বদলে একেবারে চুপচাপ হয়ে যায় সে। কখনো টানা কয়েকদিন ধরে কারোর সাথে কথা বলে না। শুধু প্রতি সকালে শিশুরা এলে আরবি পড়ায়। প্রায়ই তার ঘরের পাশ দিয়ে গেলে কুরান পড়ার শব্দ শোনা যায়। তার ঘরে একটা ধানের ডোলা আছে। বাবা মারা যাবার আগে তার জন্য কিছু জমি রেখে গিয়েছিল, সেগুলো বর্গা দিয়ে প্রতিবছর ধান পায়। বিয়ের দুই বছর পেড়িয়ে গেলেও আগে কখনো এই ঘরে ভাল করে ঢুকেনি রমিজা। আজ ঢুকে দেখে অবাক হয়। এমন সময় বাইরে পায়ের শব্দ শোনা যায়। রমিজা চমকে উঠে। ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে।

রাইতকালা হাইচো না। বেইন্নাবেলাও কোন কতা কইচো না। গুশা করচোনি?

গুশা করুম কিয়ের লায়গ্গা?

তাইলে চুপ কইরা রয়ছো কিয়ের লায়গ্গা। আমার মনডা ক লাশের হবর তুমি সব জানো। জানো না?

খোদেজা কিছু বলে না, চুপচাপ ঘরে ঢুকে। রমিজা আবার জিজ্ঞাসা করলে ধমক দিয়ে উঠে, জানলেও তর বাফের কিতা?

হুফু আমি হবর নিচলাম, শরিপ্যার মাইয়্যার জ্বর নাই। তুমি কই আচলা হেদিন রাইতে? তোমার বাইফুতেরে আমি অহনো কিচু কইচি না।

যা গিয়া কস না! আমারে ডর দেহাসনি লো সুদানির জি।

রমিজা কাঁদতে শুরু করে, আমারে হগলতা কও হুফু। তোমার কুনু বিফত অইছেনি। রাইতকালা কিতা অইচে আমারে কও।

সারাদিন আর ঘর থেকে বের হয়না খোদেজা। দুপুরে রমিজা গিয়ে খাবার দিয়ে আসে। রাতে বাদল ফিরে এলে তাকে বিয়ের কথা জিজ্ঞাসা করে। কোন পাত্রের খোঁজ পাওয়া যায় না। কয়েক সপ্তাহ কেটে যায়। শীত বাড়তে থাকে ধীরে ধীরে। ধান কাটা শেষ হয়ে আসে। মাঠের পর মাঠ খালি পড়ে থাকে। এক সন্ধ্যায় উঠানের কোণে রমিজা ধান সিদ্ধ করছিল তখন খোদেজা এসে তার পাশে বসে আগুন পোহায়।

আমার সংসার বাইঙ্গা গেচলগা কিয়ের লায়গা জানসনি ?

না হুফু।

জানস ঠিহ অয়, কইতে চাস না। বিডি মাইনসের দুইন্নাত আফন কেউ নাইলো রমিজা। জামায়, বাফ, মা, বাই, বইন কেউ আফন না। একটা জিনিস আফন আচে, বাইচ্চা। বাইচ্চা অওয়াইতে পারচিনা এর লাইগা সবে মিল্লা পর কইরা দিচে আমারে।

কিতা অইচে তোমার হুফু। ইতা কইতাচো কিয়ের লাইগ্গা?

হেইদিন রাইতে শরিপ্যার বাইতই গেচলাম আমি। হের মাইয়ার জ্বর উরচিলো। ফিরা আইবার সমো পতে রফুর লগে দেহা অইচিল।

কাদের কাহার পুত রফু?

অ। হে আমারে হুফু ডাইক্কা ডাইক্কা জান দেলা। আইন্দার দেইক্কা রফুরে কইচলাম, আমারে ইকটু আগাইয়া দেসনা । হে কি করচে জানস? একলা পাইয়া আমারে আঞ্জাদা দরচে।

ইতা কিতা কও!

আরও কিতা করচে আমি কইতাম পারতাম না। দুক্কে আমার বুকটা ফাইট্টা গেচলো গা । ডরে আমি আর বাইত না আইয়া শরিপ্যার বাইত গেচলাম গা । হের মাইয়ার লগে রাইতে থাকচি।

এই কতা তোমার বাইফুতরে কমুনি হুফু? বিচার দেই সর্দার ডাইক্কা।

না লো হুফু কেউ হুনতো না আমার কতা। বাববো মিচ-কতা কইচি। জামায়ের বাইত তিকা আইবার ফরে সর্দারও একদিন আমার লগে ইতা করচিলো। বায় রে কইচলাম সব। বায় আমারে মিচা কতা বাইব্বা আরো গাইল্লায়চে। আমারে মাগিবেডি কইচে তর হওরে। নিজের গরেও আমি বিচার ফাইচিনা গো হুফু।

রমিজা গিয়ে জড়িয়ে ধরে খোদেজাকে। চুলার আলোতে খোদেজার কান্নাসিক্ত মুখ দেখা যায়। পরদিন ভোরে আবারও খোদেজার সাথে দেখা হয় রমিজার। পুকুর ঘাটে গোসল করতে গিয়ে দেখে খোদেজা ওজু করছে। রমিজা চুপচাপ পুকুরে নেমে ডুব দেয়। পুরো শীত পড়েছে। কুয়াশায় সবকিছু ঢেকে গেছে। সামান্য দূরের কিছুও ভাল করে দেখা যায় না। রমিজা ডুব দিয়ে উঠতেই দেখে খোদেজা তার দিকে চেয়ে আছে।

কিচু কইবা হুফু?

সাপ্তাত সাত দিনঅই করতে অয় তরার। জামায়ডারে ইকটু রেহাই দিতে পারস না?

দুরুজা হুফু! যাও বেইন্নাবেলা আর বুর ফারতেঅই আইতাম না। আমার কি দুশ? তোমার বাইফুতঅই ত করতো চা।

অ বেডা মাইনসের রস কমে না জীবনে।

কথা বলতে বলতে দুইজনে হাসতে শুরু করে। সেই হাসির শব্দ কুয়াশায় দোল খেয়ে যায়। একটা ঘুঘু ডাকছিল কদমডালে বসে, মানুষের হাসির শব্দ শুনে কিছুক্ষণ থেমে থাকার পরে আবার ডাকতে শুরু করে। ঘরের ভিতর থেকে মোরগও ডেকে উঠে। একনাগাড়ে ডেকে ডেকে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় তারা। তারপরে আরও সময় কেটে যায়। গ্রামে নতুন কিছু ঘটে না আর। শীতে পুরো গ্রাম যুবুথুবু হয়ে থাকে। কয়েকদিন ধরে সূর্য দেখা যায় না। একদিন পুলিশ এসে কবর থেকে লাশ উঠিয়ে নিয়ে যায়। আগে কখনো এইভাবে লাশ তোলা হয়নি গ্রামে। অদ্ভুত এই ঘটনা সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। এর থেকে আরও নতুন গল্পের তৈরি হয়। অনেক গল্পের ভীরে শুধু আসল গল্পটির কথা কেউ জানেনা কোনদিন।

আরও পড়ুন

সর্বাধিক পঠিত