কোন সুদূরে যাই

ফিন রোবট,বক সিদ্ধার্থ অতঃপর মহিনের ঘোড়া                  

।।১।।

মন খারাপ হলে আমি যেন একটা যন্ত্র হয়ে যাই। সে যন্ত্র হতে পারে আমার বাসার ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকা সেমি বিকল ল্যান্ড ফোনটা। নম্বর চেপে কানে নিলে মাঝে মধ্যে ওপার থেকে  নৈঃশব্দ- পোকা মাকড়ের ড্রসোফিলান আলাপ শোনা যায়। কিংবা আমাদের ফিন নামের খেলনা রোবট, যার মন বলে কিছু নেই। রিমোটের কন্ট্রোল যেদিকে যেতে বলবে, যাবে; দরজায় ধাক্কা খাবার শোক সইতে না পেরে ধ্যানে বসে যাবে কাঠের মেঝেতে।

আমাকে বলা হল চার পাঁচটা পরিবার মিলে কোথাও যাবার প্ল্যান হচ্ছে। সেই কোথায়টার নাম হার্য আর তার পাহাড়। “এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে কদিন থাকলাম। একেবারে কোভিড রীতি বজায় রেখে, বাজার সদাই বিছানা পত্তর সাথে নিয়ে। দিনের বেলা রেসট্রিকশন ফ্রি এলাকাগুলোর যেদিক যেদিক দু চোখ যাবে গেলাম, এবার তো আর তোমার দেশে যাওয়া হল না।”

রেখে আসা পুরনো বারান্দার প্রান্তে বসে কবেকার এই নাগরিকের আঁধার বাড়বে নির্ঘুম- নির্জনতায়। রাতের বাতাসে। মেলে দেয়া মায়ের ওড়নার ঘ্রাণ চিনতে পারব কেবল আমিই, সেইসব অনুভুতির ক্ষতিপূরণ কি আর অচেনা পাহাড়ে আর এপার্টমেন্টের ভেতর রান্নাবাটিতে হয়? লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে লক্ষ্য করলাম, বিদ্রোহে উৎসাহ পাচ্ছি না। খুব খারাপ তো কিছু বলছেনা ওরা। মনে দুঃখ বাতাস বইতে শুরু করলে না হয় এন্টেনা বসানো রোবট মিয়া ফিনই হলাম। কপাটে হোঁচট লেগে গেলে তারপর কিছুতেই না পোষালে সিদ্ধার্থের মত নিজেকে বক ভেবে নিয়ে বাঁশবনের ওপর দিয়ে না হয় উড়ে গেলাম। কল্পনায় পাড়ি দিলাম বন পর্বত। বকের ক্ষুধায় কাতর মাছ টাছ খেয়েও নিলাম খুব!

দ্রুত হাতে গুছিয়ে নিতে হচ্ছে এবার। নাহ!  বেড়াতে যাচ্ছি নাকি গুমোট পরিস্থিতি থেকে ক‘দিনের জন্য পালাতে যাচ্ছি তাই নিয়ে তেমন অনুভূতি টনুভূতি হচ্ছেনা। বরং এমন দুর্দিনে আবার কোন বিপদে পড়ি তাই নিয়ে মাথার ভেতর অশান্তি। আমার আসলে হু হু করে বয়স বেড়ে যাচ্ছে; এইবেলা সত্যি সত্যিই বড় হয়ে গিয়েছি। না হয় এত দুর্ভাবনায় আচ্ছন্ন হচ্ছি কেন! হায় রে পাষাণ করোনা! তুমি আমাকেও আমার নানুর মত টেনশন আর টেনশন- টেনে আনা টেনশনের কৃষ্ণ গহ্বরে ফেলে দিচ্ছ!

।।২।।

যাচ্ছি হার্যে। পাহাড়ে- অরণ্যে, পর্বতের আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা কোন লোকালয়ে। মেদহীন ছিপছিপে এক রোদের সকালবেলা আমাদের পোষা পঙ্খীরাজে চড়ে। এইসব সকালে যা যা থাকা দরকার তাইই আছে। বাহুল্য বর্জিত। ভীষণ মাপা মাপা সৌন্দর্যবোধের ভেতর আমাদের চাকাওয়ালা পঙ্খীরাজ চালকের উড়াল চিন্তার খপ্পরে পড়ে হাইওয়েতে উড়ে উড়ে চলতে চায়। বাকি পরিবারগুলোও যার যার গাড়ির ভেতর আছেন। বিরতিতে দেখা হবে মাস্কের আবরণে- আমরা ডিসইঙ্কফেকট্যান্টের বর্ম হাতে দিয়ে ঘরে বানানো কেক শিঙ্গাড়া এক সাথে খেয়ে নেবো, ছেঁড়া ছেঁড়া দ্বীপ হয়ে কফির ধোঁয়ায় দিন যাপনের পরিকল্পনা করবো।

শহরের  বাঁক পেরোতেই ফসলের মাঠে মৃদু বাতাসের আনাগোনা। ঘরের গভীর কিংবা নোনা ধরা দেয়ালের লুকোনো ফোঁকর থেকে তুলে আনা দুশ্চিন্তায় দুশ্চিন্তিত আমার নানুর আত্মা নেমে গিয়ে পুরনো আমিটা ফিরে এলো তখন। ঝলকে ঝলকে ওঠা পেশীর শরীরে কতগুলো ঘোড়া এদিক সেদিক হাঁটছে, মুখ ডুবিয়ে খড় বিচালি খাচ্ছে। আপন মাঠ চেঁচেঁ সেথা বেড়ানো বুঝি আহা একেই বলে! আমি আনমনে বললাম, অস্ফুট;

-এরাই মহিনের ঘোড়াগুলি। এরাই।

-মহিন আবার কে? আউট অব নো হোয়্যার তুমি কার কার কথা যে বল!

 

হৃদয়পুরের দেখা নাই, সান্ত্বনা বনগাঁও

হামবুর্গ থেকে হার্য অত দূরে না। সমভূমি থেকে পার্বত্যাঞ্চলে যাবার কারণে গন্তব্যের নিলাদ্রি উঁকি দিচ্ছিল  থেকে থেকে। হার্য পর্বতমালা মোটামুটি নিদারযাক্সেন, যাক্সেন আনহালট আর থুরিঙ্গা স্টেট জুড়ে আছে। ঘণ্টা তিনেক প্রাইভেট কার ডিস্টেন্সের যাক্সনি আনহালটে যাচ্ছিলাম আমরা। মাঝে কেবল একটা ফিলিং স্টেশনে আধা ঘণ্টার স্ন্যাক্স বিরতি নিতে হয়েছিল।  আমাদের সফরসঙ্গী ছানাপোনা সমেত আরও চারটা পরিবার। আজীজ এন্ড দীপা, সালাউদ্দীন এন্ড পপি, হায়দার এন্ড রাখি, মাহবুব এন্ড হাসিনা পরিবার। আমাদের দুটো চিপমাঙ্ক সহ নানা বয়সের নানা স্বভাবের সব মিলিয়ে এগারোটি ছানাপোণা। কফির ঘ্রাণে চাঙ্গা হতে হতে জমাট বেঁধে উঠছিল গল্প। অন্যান্য সময় এইসব গল্প জটলার ভেতর স্বাভাবিক শ্রাব্যতার সীমার ভেতর হত, এখন দুই হাত দূরে দাঁড়িয়ে কেমন জোরে জোরে। পপি ভাবীর আনা ডালপুরীতে কামড় বসাতে বসাতে খবর পেলাম রাখী ভাবী সারপ্রাইজ দেবেন আমাদের দুপুরবেলায়। দীপা ভাবী পাউন্ড কেকের থালা নেবার সময় জানালেন “অত কফি খেয়ে খেয়ে পেট ভরে ফেলো না ঝুমি!( আমাকে শুধু উনি না, অনেকেই ঝুমি ডেকে স্বচ্ছন্দ্য) ফ্লাস্কে দুধ মালাই চা আছে কিন্তু এই বলে দিলাম!”

এরকম টং ঘরের মত বাংলা চা অনেকদিন পর পেটে পড়েছে। আরামে চোখ প্রায় বন্ধ হয়ে আসছিল বারবার। আধবোজা চোখেই দেখছিলাম যাবতীয় ফুল পাখি লতা পাতা, পুকুর  ছোট নদী বুনো হাঁস, পেতে রাখা সবুজের শতরঞ্চি, মহিনের ঘোড়া সব কিছু সাথে নিয়ে দূরের নীল পাহাড়ের দিকে এগোচ্ছি। যেহেতু অন্যান্য সময়ের মত অত গুগল টুগল ঘেঁটে কোথা যাচ্ছি প্রবৃত্তি ছিল না খুঁজে দেখার তাই একবার ভাবলাম হয়ত হৃদয়পুরে যাচ্ছি।

তবে জার্মান হৃদয়ে একটা “e” থাকে (Herz) আর ফলকে লেখা হার্যে আছে “a” (Harz)। এই ফারাকের কারণে অল্পের জন্য হৃদয়পুর নামের কোন জায়গায় যাওয়া গেল না। গুগল জানালো হার্যকে হারযগ্যাউ বা হার্যগাও ডাকা হত মধ্যযুগে। এটা ছিল সে সময়ের জেলা শহর।  পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড়ি বন তো আছে সেখানে। হৃদয়পুর না হলেও কোন এক বনগাঁয়ে যাওয়া যেতেই পারে।

তো এই বনগাঁয়েতেই একসময় হাইনরিশ হাইনেকে পেয়ে যাই। ল্যান্ডস্কেপে রেখে যাওয়া অদ্রশ্য অস্তিত্বে- পায়ের ছাপে, কবিতায়, পাথরের ফলকে।  তরুণ হাইনে নরম সবুজ আর শিলীভূত গাম্ভীর্যের ভেতর নিজেকে খুঁজে দেখতে বিভোর হয়েছিলেন এখানে।

হাইনরিশ হাইনে ভেগ কিংবা ব্রোকেন নামগুলো স্ক্রিণে পড়তে পড়তে জানালায় চোখ যেতেই টের পেলাম পুরনো দিনের এক সরাইখানার শহরে চলে এসেছি। দুপুর রোদে তেঁতে উঠছেনা গমগম করছেনা। খুব গোছানো বন্ধ কপাটের সারি সারি সব বাড়ি। হাফ টিম্বার্ড হাউজ এগুলো। দেয়ালের গায়ে দৃশ্যমান কাঠের তক্তাগুলোর লম্বা বাঁকা দাঁড়িয়ে থাকা বেশ দৃষ্টি কেড়ে নেয়। নুড়ি পাথরের চৌখুপি পথ চোখে পড়ে। জনশূন্য জানালার বাগান থেকে চুল এলিয়ে দেয়া বোগেনভিলিয়ার সাথে টিউলিপ, ইংলিশ ডেইজি  কিংবা ভিওলাদের দেখা মিলছে। দেখা মিলছে দেয়াল আঁকড়ে ধরা আদি ল্যাম্পপোস্টের।

নিশ্চুপ হার্য

কফিখানা যেগুলো চোখে পড়ছে জনমনিষ্যির দেখা নেই। তবে দুইদিকে নিপাট নানা রঙের  ইটের গায়ে লম্বা লম্বা দাগটানা কিংবা পুরনো আদলের একেবারে যথার্থ আদলের সরাইখানা সমেত টানা রাস্তায় অল্প কিছু ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি চলছিল। মাস্ক মুখে হাতে গোণা কিছু মানুষও চলছিল ধীরে ধীরে। সে চলায় ব্যস্ততার তেমন ছাপ নেই। হয়ত তারা আমাদের মতন সীমান্তের ভেতর একটু অবকাশের আশায় এসেছেন। অন্যান্য বছরগুলোর মত বাইরের দেশ থেকে পর্যটক আসতে পারেনি, আবার দেশের ভেতরের পর্যটকেরা বাইরে ছুটি কাটাতে যেতে পারছেন না তাই এই দেশের ঘাসের ডগা কিংবা শিশির বিন্দু খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছেন।

মন্দের ভালো তো, ভালো না?

 

হইচই এবং অবকাশের দিনলিপি

।।১।।

পাশাপাশি দুটো ডুপ্লেক্স ভাড়া নেয়া হয়েছে। দুটো বিল্ডিংএরই নীচতলাতে রান্না- খাবার ঘর কাম বসার ঘর আর একটা গেস্টরুম, ওপরতলায় শোবার দুটো ঘর আর বিশাল টানা বারান্দা। মালপত্র সব এনে রাখা হল প্রথম এপার্টমেন্টের নীচতলায়, বসার ঘরে। আমরা সব বেলার খাবার ভাগাভাগি করে রান্না করে এবং বাজার করে এনেছিলাম। সেগুলো এখন ফ্রিজে বা যথাস্থানে রাখার দরকার। সেই সাথে কে কোন ঘরে দুইদিনের সংসার পাতবে সেটাও ঠিক করা দরকার। গল্পের সুবিধার্থে ধরে নিই প্রথম এপার্টমেন্টটার নাম হইচই আর দ্বিতীয়টার নাম অবকাশ। হইচই এর নীচতলাতে সবাই একসাথে সব বেলাতে খাবে পরিকল্পনা এমন হল। বৈকালিক চা- আড্ডা বা ইবাদতের মগ্নতার জন্য অবকাশকে বেছে নেয়া হল। আর ওপরতলাগুলোতে তো দরকারমত শোবার ঘর আছেই। যাদের ছেলেপেলে একটু বড় তারা হইচইতে অবস্থান করবেন এমন সিদ্ধান্ত হল। পরেরটায় ছোট শিশুওয়ালারা। আমি অবকাশে চলে গেলাম মালসামান নিয়ে। দুই বাড়ির পেছনের বারান্দারা। তারা দুই স্বভাবের দুই বন্ধু। ঘরে বালিশ বিছানা পাতা শেষ, বাচ্চাদের ধোয়া পালা- খাওয়ানো শেষ, তারা এ বাড়ি ও বাড়ি হেঁটে বেড়াচ্ছে রাজহাঁসের মত। আমি অবকাশের খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড়ের ফিসফিস এবং প্ররোচনায় কান পেতেছি কেবল। পাহাড়ের ওপর দেখা যাচ্ছিল একটা শ্লস, বাংলাভাষায় দুর্গ। ঠিক যেন জন্মদিনের কেকের ওপর টেঁসে রাখা দুর্গ। টাওয়ার, র‍্যাম্পার্টস, গেটওয়ে সব বানানো হয়েছে ফনডেন্টে। মনে হল আকাশ ভেঙ্গে বরফ পড়ার দিনগুলোতে পাহাড় ঢেকে যায় বরফে, দুর্গও তো ঢেকে যায়। দৃশ্যটা তখন আরও মাখন মোলায়েম কেকসুলভ হবার কথা। আর তখন খেয়াল করলাম বেলা গড়িয়েছে। শান্ত দুপুর বলে ঘড়ি দেখতে প্রবৃত্তি হচ্ছেনা। ক্ষুধা লেগেছে আসলে। ক্ষুধার রাজ্যে ঢুকে পড়ার কারণে পাথুরে শ্লসকে কেকের টপিং বলে ভ্রম হচ্ছে। কোইন্সিডেন্টলি হইচই থেকে এক শিশু দূতের মাধ্যমে খবর এলো রাখী ভাবীর সারপ্রাইজ ইতিমধ্যে ঘোষিত হয়ে গিয়েছে। দম বিরিয়ানি খাওয়ার ডাক এসেছে ও বাড়ি থেকে।

।।২।।

বিকেলেই কাছের প্ররোচনা দানকারী পাহাড়টায় যাবার কথা আছে। অথচ বিরিয়ানিঘুমের আলস্যে টাল হয়ে গিয়েছি যেন। এইসমস্ত সফরে হাল্কা খাবারের পক্ষে সবসময়। তাহলে হাঁটতে সুবিধা- দেখতেও। আমি ঘুম তাড়াতে টি ব্যাগের বন্দোবস্ত করছি যখন দেখতে পেলাম রাখী ভাবী আরামদায়ক হাঁটার পোশাক, জুতো, গগলসে একদম তৈরি। বাচ্চারাও সবার আগে ফিটবাবুটি। যে রাঁধে সে তো চুল বাঁধবেই, গুরুজনেররা তো হিসেব করেই ভবের মাঝারে বাণীগুলো ছেড়েছিলেন! আদনান জুম্মি দম্পতির ভেতর যার নাম আদনান তার কানে অধিকাংশ সময়ে থাকে ফোন। প্রজেক্ট- প্রেজেন্টেশন কিংবা লোকাল ক্রিকেট সিরিজের ভেন্যু- ফুটবলের জার্সি… কথার গাড়ি চলছে তো চলছে- চলছে তো চলছে। পাহাড়টা ছোট খাটো হলেও কিছুটা খাঁড়া। ওপরে উঠতে একটু ঝামেলা হচ্ছিল। এইসব খাঁড়াত্ব বা ঝামেলা তার ফোনালাপে ব্যত্যয় ঘটাতে পারছিল না। সে আলাপে আলাপে সকলের পেছনে পড়ে গিয়েছিল। এত মানুষের সামনে রাগ দেখানো যায় না। তাই ফোন একান ওকান প্রতিভায় মুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায়ও থাকেনা। তার ওপর সাথে আছে বাচ্চারা। সবগুলো বাচ্চা টুই টুই গল্প করতে করতে ভালোই পাহাড় বাইতে পারছিল। আমার বড় চিপমাঙ্ক সালাউদ্দীন ভাইয়ের হাত ধরা। তবে চার বছর বয়সী ছোটটা চঞ্চলতার অবদমন করতে পারছিল না। বারবার হাত ফস্কে কোন বনে যেন ছুটে যেতে চাচ্ছিল। আমি তখন ছোট চিপমাঙ্ককে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রেখে- মুগ্ধতাকে ভাগিয়ে দিয়ে একপাশে দাঁড়ালাম। রাগমুখী হয়ে আলাপীর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। দৃষ্টিতে “আজকে তোমার খবর আছে”!  দূর থেকে আমাকে ওভাবে শ্যেন দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কী করবে বুঝতে না পেরেই হয়ত হাসি হাসি মুখে পাহাড়ের একদম কিনারায় গিয়ে পড়ে যাবার অভিনয় করল।  তার অভিনয় বেশ ভাল হয়েছিল। কোত্থেকে যেন একটা ডানা ঝাঁপটানো চিল চিকণ চিৎকার হয়ে হাত বাড়ালেই ধরা যাবে এমন আকাশে মিশে গেল।

দৈত্য চাচা শুয়ে আছেন, শূন্যতায়

।।১।।

লোকে হার্যে আসে যতগুলো কারণে তার ভেতর অন্যতম কারণ স্থানীয় দৈত্যদানো আর ডাইনিবুড়ি। আমাদের মাহবুব ভাই এবারের সফরে মূল গুগল ঘাঁটাঘাঁটি এবং রেকমেন্ডেশনের দায়িত্বে ছিলেন। তার হিসেবে টিটানে না হেঁটে হার্য ঘোরার মানে নাই। গ্রিক মিথলজির টিটান দেখার উদ্দেশ্যে রওনা করলাম সকাল সকাল। নারায়ণগঞ্জের সন্তান জনাব সালাউদ্দীন ভাইয়ের নেতৃত্বে সকালের নাশতা নামক অলমোস্ট বিয়ে খেয়ে। ভাইজান মানুষকে বেড়ে খাওয়াতে খুব পছন্দ করেন। তার কাছে ব্যপারটা অনেকটাই রিচুয়ালের মতন। উনার স্ত্রী পপি ভাবী ছাড়া এমন হামবুর্গবাসী নাই বললেই চলে যারা ভাইজানের এই রিচুয়াল সাফল্যের সাথে এড়াতে পেরেছেন। দেখা গেল “আম্নের পেলেটে তো কিছু দেহা যায়না! কী খাইতাছেন? একটা রুটি লন, আর এক চামিচ মাংস লন, খাড়ান আমি দিতাছি…” বলেই সুকৌশলে প্লেটের ওপর বিন্ধ্য পর্বতমালা ঢেলে দেন সাধারণত।

সালাউদ্দীন ভাইয়ের নিবিড় তত্ত্বাবধানে সকাল সকাল এমন বিয়ে খাওয়ার পর একটা ব্ল্যাক কফি না নিলে ঘুম ঘুম বিষণ্ণতায় ডুবতে হবে। সুতরাং চুমুকে চুমুকে গিলছিলাম  হাইওয়ে, দু দিকের সবুজ। তার সাথে যোগ দিচ্ছিলো পাহাড়ের দেয়াল। আর হার্যের চুড়া দৃষ্টি সীমানাকে ছুঁয়ে তো থাকে সবসময়। পুরো হাইওয়েতেই সবুজে সবুজে চোখে জ্বালা ধরে গেল। গোটা যাক্সেনের সাথে সবুজাভ সীমান্তের আছে বিরাট যোগাযোগ এবং ইতিবৃত্ত।

ঠিক তখন অতীত এসে টুপ করে গাড়িতে উঠে পড়ল। জানালার অর্ধেক নামানো কাঁচে বাতাস নাচছে, সেখানে মিশে গিয়েছে তার আগমনী ঘ্রাণ। মহামতি অতীতের ঢলঢল নীল ভায়োলেট চোখ দেখা যায় যেন লুকিং গ্লাসে। গাল জুড়ে ফুটেও উঠেছে গোলাপের আভা। আগের রাতে হাইনরিশ হাইনে আর রবিবাবু পড়ার ফল মূর্ত হয়ে উঠেছে বিগতের চোখে মুখে। আমি নিশ্চিত হলাম পেছনে বসা অতিক্রান্ত সময়টি একজন নারী। ।

জানলাম এমন তীব্র সবুজের নেপথ্যে আছে শীতল যুদ্ধ। জার্মানি ভেঙ্গে দুই খণ্ড হয়ে গেলে মাইন ফিল্ড, বিদ্যুতায়িত কাঁটাতার, ওয়াচটাওয়ার আর টহলদার পুলিশদের অস্ত্রশস্ত্র, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরদের ঘ্রাণগ্রন্থী এইসব ছিল জিডিআর আমলের নিত্যবিষয়। যাক্সেন টাক্সেন এইসব এলাকা তখন জিডিআরের মানচিত্রে থাকায় এখানকার সীমান্ত এলাকা ছিল ডেথজোন। সে তো সবাই জানে পশ্চিমে যাওয়া কতটা বারণ ছিল। এই হার্য পাহাড়ও ছিল নিষিদ্ধ এলাকা। হার্যের চূড়া, যার নাম ব্রোকেন, সেই ব্রোকেনে ছিল ওয়াচটাওরের তীর অথবা বুলেটচক্ষু। জার্মানির রিইউনিফিকেশনের দিনটিতে প্রায় এক লক্ষ উত্তেজিত এবং মুক্তিকামী জনতা ব্রোকেনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে কাঁটাতার ছেঁড়ার মাহেন্দ্রক্ষণ উদযাপন করা শুরু করে দেয় তৎক্ষণাৎ।

অতীতের সেই ডেথস্ট্রীপ সময়কে অতিক্রম করে তারপর লাইফলাইনে মোড় নিয়ে নিল। সীমান্তে ছড়ালো সবুজ আভা। কংক্রিটের দেয়াল মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এখন গ্রিন বেল্ট। বিশুদ্ধ প্রকৃতি বড় আদরে পেলে পুষে দেখে রেখেছে জীব বৈচিত্র। বিলুপ্তির পথে ছিল যাদের কেউ কেউ। এই গ্রিন বেল্টের ব্যপ্তি উত্তরমুখী  নিদারযাক্সেন থেকে শুরু করে একেবারে যাক্সেন তক। চল্লিশ বছর  ধরে যেখানে মানুষের পায়ের শব্দের অর্থ ছিল মৃত্যুকে ডেকে আনা আজকে সেখানে ভারসাম্য পাচ্ছে ইকোলজি , আর তৃণভূমিও কৃষকের আবাদের ঘ্রাণে ম ম।

।।২।।

টিটান দৈত্যের কাছাকাছি চলে এসেছি। সাথের চিপমাঙ্কদের মতন জানালা থেকে চাতক পাখির হয়ে দেখতে পেলাম ওপাশে বাঁধের চিহ্ন আছে। তার ওপর দিয়েই দৈত্যচাচা লম্বা হয়ে শুয়ে আছেন।  দৈত্যচাচার অফিশিয়াল পরিচয় তিনি দুনিয়ার বুকের সবচেয়ে লম্বা স্তম্ভবিহীন ব্রিজ। জার্মানরা গ্রীক মিথলজির অমর দৈত্যের নামে তাকে আদর করে ডাকে “টিটান এরঠে”। র‍্যাপবোড বাঁধের ওপর প্রায় পনেরশ ফিট উঁচুতে উনি বিশ্রামে গা এলিয়ে থাকেন। রড কংক্রিটের মিশেলে তার ফুল বডি।

টিটানের গায়ে হাঁটার আগের মুহুর্তটা একটু ক্যার্নিভ্যাল কার্নিভ্যাল। মানুষের হাতে ধরা অপেক্ষার আইস্ক্রিম, হাওয়াই মিঠাই, মার্জিপান। একটু থেমে থেমে ডেয়ারডেভিলদের পেন্ডুলাম জাম্পের গগনবিদারী চিৎকার।

করোনাকালীন আবদ্ধ সময়েও ভালো ভিড় হয়েছে দেখছি! স্বাভাবিক পৃথিবী যখন ছিল না জানি কত মানুষের আনাগোনা ছিল এখানটায়! পশলা বৃষ্টির ছাঁট এলো হুট করে, চোখে পলকে। কার্নিভ্যাল মোমেন্ট তার ওপর শীতল স্নিগ্ধ বিন্দু এক একটা। আমার ছোট চিপমাঙ্ককে দেখতে পেলাম কোণ আইস্ক্রিম পেতে আছে বৃষ্টি বরাবর। পোয়েটস অব দ্য ফল হয়ত জানেওনা তাদের “কাম ফিড দ্য রেইন”র কত রকমের অর্থ হয়- দৃশ্যায়ন হয়!

ওঠার পর টিটান কেঁপে উঠল কেমন, নাক ডেকে ঠিক এপাশ ওপাশ। আমার ভেতরটা তখন কাঁপে। খুব বেশী  না অল্প অল্প। সেতুর ডানপাশের সাধারণ ব্রিজের ওপর দেখতে পাচ্ছি দীপা ভাবী আর আজীজ ভাইকে। নিবিষ্ট হয়ে আমাদের দেখছেন। দীপা ভাবীর আবার চাচামিয়ার সুরত দেখেই বুক ধড়ফড় করে ওঠায় তিনি আমাদের সাথে পারাপারে আসেননি। ভাইয়েরও কার্ডিও প্রব্লেম আছে, আসেননি তিনিও।

ছোট চিপমাঙ্ক হাত ধরা আমার। বড়টা আদনানের। ছোট খুব স্মার্টলি হাঁটছিল। ঠিক যেমন নিয়মিত মসৃণ পীচের রাস্তায় মানুষ সাবলীল হাঁটে। এই সাবলীলতা কী বুঝে নাকি না বুঝে? কী জানি!

বড় চিপমাঙ্ক এগোতে এগোতে বুঝতে পারছিল ফারাকগুলো। গাইগুই করছিল বেশ একটু। তবে মাঝসেতুতে যাবার পর যখন বাতাসের দমক ঠেকাতে শক্তি ক্ষয় করতে হচ্ছিল, সেতু দুলছিল পালকের মত, চোখ খুলে রাখা হয়ে পড়ছিল ভীষণ দায় তখন বড় শুরু করল চিল চিৎকার! তার নাকি সব কিছু ভীষণ শূন্য মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে “এভ্রিথিং ইজ কমপ্লিটলি ব্ল্যাঙ্ক!”

তাকে এক চুলও নড়ানো যাচ্ছিল না!

আমি এগোচ্ছিলাম তার দিকে। আকাশটা কী পরিমিত নীল! আগের দিনের মতই দিনের আলোর রঙটা যেমন হওয়া দরকার ঠিক তেমন- কোন বাহুল্য নেই সৌন্দর্যে, সবুজের আশকারায় আরও দীপ্তি ছড়াচ্ছে দীপ্র সব সৃষ্টি, তবুও মানুষের এত শূন্য- কমপ্লিটলি ব্ল্যাঙ্ক মনে হয়?

ছোট ছোট পদক্ষেপে অথচ নির্বিকার হাঁটতে থাকা ছোটকে সাথে নিয়ে এগোচ্ছিলাম আমি।

সেতু অভিজ্ঞতা খুব মিক্সড। টিটান নিয়ে সবচেয়ে বেশী আগ্রহ এবং গবেষণা ছিল হাসিনা ভাবীর, তিনি বেশ ভয় পেয়েছেন বলে স্বীকৃতি দিলেন। পপিভাবীরা রোমাঞ্চটা উপভোগ করতে  পেরেছিলেন বলে মনে হল। রাখী ভাবী পুলসিরাত পার হবার ভয়াবহ মুহুর্তের কথা স্মরণে রেখেই চ্যালচ্যালিয়ে পার হয়ে গিয়েছেন বুঝি। দীপা ভাবী যশোরের টানে জানালেন যে তিনি ওতে না উঠেও কাঁপিছেন ভেতর ভেতর। ছেলেরা ছবি তুলছিলেন কিছু পর পর। আমার পেছনেই ছিল দীপাভাবীদের দুই ছেলে আদীব আর আইদিদ। মাথায় বড় হয়ে যাওয়া দুই কিশোর। দুই ভাই কুট কুট করে গল্প করতে করতে অবলীলায় পেরিয়ে যাচ্ছিল  আলো বাতাস আর মেঘের দুলুনি। চিত্ত যেখানে ভয় শূন্যের মতন ব্যপারটা।

সেও আরেক শূন্যতা বটে!

।।৩।।

দৈত্যের দেখা তো পেলাম, এখন ডাইনির কী খবর? হার্য কিন্তু ডাইনি পুরাণের জন্য রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের আরাধ্য জায়গা। রাতের বেলা আধো আলো আধো অন্ধকারে সে গল্প পড়েছি অবকাশে ফিরে এসে। প্রায় সাড়ে এগারোশো মিটার উঁচুতে থাকা হার্যের চুড়া ঢেকে থাকে ঘোর কুয়াশায়। বছরের বেশীরভাগ সময়েই। আর সেখানকার আবহাওয়াও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশী রুক্ষ্ম।

হাইনরিশ হাইনের মতন  গ্যোটে সাহেবও নাগরিক ভিড়ে ত্যাক্ত হয়ে পাহাড়বাসে এসেছিলেন একদা। সে সময় হার্যকে ঘিরে এত আয়োজন বা এত মানুষের আনাগোনা ছিলনা। তার বদলে ছিল আলো- অন্ধকারের লুকোচুরি খেলা; অপার্থিব সব ছায়া। চূড়া থেকে নীচে তাকিয়ে তার মনে ভর করেছিল নিঃসীম একাকীত্ব।

So lonely, I say to myself, while looking down at this peak, will it feel to the person, who only wants to open his soul to the oldest, first, deepest feelings of truth.

সেই সাথে প্রগাঢ় অরণ্যের আস্তরণ, হাড় ছিদ্র করে দেয়া কর্কশ বাতাসের আবহ ক্রমাগত কুয়াশায় বুঝি প্ররোচিত হয়েছিলেন তিনিও। তাই তার অমর সৃষ্টি ফাউস্টে দাওয়াত করে ডেকে এনেছিলেন ব্রোকেনের লোমহর্ষক সব শয়তানদের কিংবা গা ছমছম জাদুকরীদের।

ভেরিংগেরোডার শ্লস এবং গসলারে রোদের ছিটে 

মাহবুব ভাই গতরাতেই সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। আজকের দিনের গন্তব্য ভেরিং না কী জানি একটা  জায়গার দুর্গ। খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। হার্যে এলে এখানে আসতে হয়।

তো সেই ভেরিং না কী জানি গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটা আমাদের হইচই আর অবকাশ থেকে অত দূরে না। ভেরিংগেরোডা নামটা মুখস্ত হতে হতে কিছুক্ষণ আকাশ বাতাস দেখলাম তারপর পৌঁছেই গেলাম।।

জার্মান সম্রাটরা শিকার যাত্রার বিরতিস্থল হিসেবে এই এলাহী কারবার বানিয়েছিলেন। ঢোকার ইটপাথরের তোরণটা এইই উঁচু। তোরণ পেরিয়ে দুর্গের দিকে যাবার পথটা ক্রমশ উঁচু হচ্ছিল। পাহাড়ের চুড়া বলে কথা। আমার তৃতীয় চক্ষু দিয়ে সৈন্য সামন্ত সহ ঘোড়া গাড়ির বহর যেন দুর্গের দিকে যাচ্ছে এমন দেখতে পাচ্ছিলাম। ঘোড়ার দুলকি চালের শব্দও যেন কানে এসে পৌঁছেছিল সুদূর অতীতের ব্যারিকেড ডিঙ্গিয়ে। আমার মনে হচ্ছিল এক শীতে এখানে আসা দরকার। ওই যে আকাশ ভেঙ্গে বরফ পড়া কোন শীতে। আজ কোন খিদে না থাকায় কেক টেক না বরং কত হীরে মানিক তখন চমকায় দূর থেকে সেখানে এমনটাই মনে হল।

ভেরিংগেরোডার কাউন্ট, কাউন্ট ক্রিশ্চিয়ান এরনেস্ট, কাউন্ট অটো সু স্টোলবার্গের হাত ঘুরে মহাযুদ্ধের শেষ বছরে এই শ্লস সোভিয়েত সামরিক প্রশাসনের দখলে যায়। অন্যান্য শ্লসের মতন এই শ্লসেরও শরীরে তাই ইতিহাসের পালাবদলের চিহ্ন। রোমান এম্পায়ারের সময় একে বলা হত ক্যস্ট্রাম।

কাউন্ট অটোর বর্নীল ক্যারিয়ার এক্ষেত্রে না উল্লেখ করলেই নয়। ভদ্রলোক প্রথমে ছিলেন প্রুশিয়ান রাজ্য হানোভারের প্রেসিডেন্ট, ছিলেন ভিয়েনার জার্মান রাষ্ট্রদূত, জার্মান সাম্রাজ্যের স্থপতি অটো ফন বিসমার্কের ডেপুটি, ছিলেন ডেপুটি প্রুশিয়ান প্রধানমন্ত্রী।

দুর্গের চত্বরটায় একটু ভাবনার জগতে হারাতেই হল। মেডিয়েভাল যুগকে প্রেক্ষাপট বানিয়ে করা সাদাকালো সিনেমার মত ঠিক। তফাৎটা কেবল অরুনেন্দু দাসের “এত রঙ আছে এই পৃথিবীতে কোন রঙ বলো চাই” তে এসে পট পরিবর্তন করে ফেলে। কত যে রঙ দুর্গের চারদিকে! ভেরিংগেরোডার চত্বরে বা হার্যের জঙ্গলে এসে বিপ্লবীদের দঙ্গলেরও ফুলের সৌন্দর্যে তরলমনা হওয়াটা বিচিত্র কিছু মনে হল না। দেশত্যাগী, বিদ্রোহী এবং পরিহাসের কবি হাইনে এক ফুল নিয়েই কত গাথা লিখে রেখে গিয়েছেন। প্রিয়তমাকে সাত সকালে বনপথের বেগুনি ফুল পাঠাতে চেয়েছেন তো সন্ধ্যেবেলায় কুঞ্জ থেকে ছিঁড়ে আনা গোলাপ। আবার জনাব হাইনের কবি হৃদয়ের রক্তক্ষরণ যদি এইসব প্রসূনেরা জানত তবে তারাও আপন কষ্ট মেনে অশ্রুসিক্ত হত বলে তিনি নিশ্চিতও বটে।

রাজাবাদশাহদের কায়কারবার দেখতে ভেতরে ঢুকেছিলাম। করোনার কারণে খুব অল্প মানুষ এক সাথে ঢোকার অনুমতি ছিল। পূর্ণবয়স্ক দু জন দু জন করে, বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যপার। টিকিট হাতে লাইনে দাঁড়ানোকালীন সময়ে আমার মনে হল  ওপরের ওই খোপের মত জানালাটায়  মই কেশের অধিকারী রাপুনযেলকে বেশ মানায়। এত সরু সিঁড়ির আভাস পেয়ে হাতে চিপমাঙ্ক নিয়ে সিঁড়িও বাইতে ভালো লাগছিল না। মন চাচ্ছিল জাদুকরী ডাইনির মত ডাক পেড়ে ছড়া কাটি,

Rapunzel!

Rapunzel!

Let down your hair

That I may climb thy golden stair!

 

শ্লসের ভেতর ঢুকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সংলগ্ন চার্চ, বারান্দাবাগান, খাবার ঘর, শোবার ঘর, বসার ঘরগুলো দেখতে হল, তবে অবশ্যই গতানুগতিক চোখে, দিব্যদৃষ্টি প্রয়োগ করার তেমন সুযোগ হচ্ছিল না। একটা তুলনামূলক ছোট্ট ঘরে ঢুকে বেশ একটু আপন আপন মনে হল। বিছানাও ছোট। জানালার পাশে টেবিল চেয়ার রাখার ভঙ্গী দেখে মনে হল কোন কবি হয়ত লিখতেন এখানে বসে, পৃথিবীর রঙ দেখতে দেখতে।

এখান থেকে দূরের কত কিছু দেখা যায়। মাইন এবং রূপার জন্য বিখ্যাত গসলার শহরের ঝলকও দেখা যায়। সেই নবম শতাব্দী থেকে খনি আর তার আকরিক টাইগ্রিস ইউফ্রেটিস তথা মেসোপটেমিয়াতেও রপ্তানি হত। তবে মহাযুদ্ধ শীতলযুদ্ধে থেমে গিয়েছিল মাইনের কার্যক্রম। নাৎসি আমলে হার্যের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমানে অস্ত্র শস্ত্র প্রস্তুত করা হত, খনি কার্যক্রম সাইডে রেখে গসলারেও তাই। পুরো হার্যে গড়ে উঠেছিল ফোর্সড লেবার ক্যাম্প। ধরে এনে এনে মানুষকে দাস বানিয়ে রাখা হত। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ডোরা আছে এখানে। কুখ্যাত হাইনরিশ হিমলারের নেতৃত্বাধীন হিটলারের এলিট ফোর্স ওয়াফেন এসএস ক্যাম্প ডোরার বন্দীদের সুড়ঙ্গ খননে বাধ্য করত। কাজ করতে বাধ্য করা হত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভুগর্ভস্থ অস্ত্র এবং গোলাবারুদ ঘাঁটিতে যার ফলে মারা গিয়েছিল বিশ হাজারেরও বেশী বন্দী। পরিত্যাক্ত খনি খাদ থেকে আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নীলনকশাও করা হত।

দুই জার্মানির দেয়াল ভাঙার পর আবারো সচল হয়েছিল গসলারের চাকা। এইসব সীসা দস্তা হেভিমেটালের ভার অবশ্য ইকোসিস্টেম নিতে পারেনা। নিয়ন্ত্রণে কমতি থাকলে তার প্রভাব প্রকৃতিতে পড়েই যায়। জার্মানির নিয়ন্ত্রণচেষ্টা আছে এটা ভালো। গসলারের মাইনে সমৃদ্ধ গোটা ভূমি। ভেরিংগেরোডার চত্বরের কার্নিশ থেকে দেখি রোদ পড়ে চিকচিক করছিল গসলার। মনে হচ্ছিল আবার যখন আসব এখানে,  কোন এক রূপালী চাঁদের রাতেই না হয় আসবো। রূপার শহরের টেক্সচার, রঙ, ঘ্রাণ নিতে পারা যাবে আরও গভীর থেকে।

এর আগেও এই জনপদ জনশূন্য হয়ে পড়েছিল ব্ল্যাকডেথের কারণে। বিউবনিক প্লেগ ছিল সে সময়ের অতিমারি। আমাদের সময়ের অতিমারির সাক্ষী হয়ে অনুজীব আর জীবের ধ্বংসলীলার পর উঠে দাঁড়ানো শহর দেখতে গিয়ে শুধু মনে হচ্ছিল সময়ের জন্য অপেক্ষাতে খুঁজে বেড়াতে হয় মহাসান্ত্বনা।

“আমার মুখের পরে নীরবে ঝরিছে খয়েরি অশ্বথপাতা – বইঁচি শেয়াল কাঁটা আমার এ দেহ ভালোবাসে”

।।১।।

রাত বাড়ছে। গ্রীষ্মের অল্প একটু রাত বেড়ে আর কত দুরেই বা যায়? খাবার টেবিলে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং, অটোফেজির গুষ্টির খ্যাতা পোড়ানো হচ্ছে। সালাউদ্দীন ভাই একশনে আছেন মোটামুটি। “হ ভাই! আমনেরা জুয়ান মানুষ একদিন খাইলে কিছু হইতো না” বলতে বলতে আজকে থালায় মৈনাক পর্বত তুলে দিচ্ছেন দেখতে পাচ্ছি। ডাক পড়ার আগেই বকের মত ভাগার দরকার অবকাশে। দেখি বারান্দায় কাউকে পাই কিনা। কফির তেষ্টা পেয়েছে।

পালাবার সময় আধ খোলা জানালায় চোখ পড়ল এক পলক। নাহ, সবাই হইচই এর নীচ তলাতেই আছেন এখন। আদনান নিজের  প্লেটের দিকে করুন চোখে তাকিয়ে আছে। সালাউদ্দীন ভাই এবার মাহবুব ভাইকে টার্গেট করেছেন যা বুঝতে পারলাম। ভাবীরা কেউ চা চামচ নাড়ছেন-  কেউ বাচ্চাদের খাবারের বন্দোবস্তে।  আমি শ্লস থেকে এসেই আগে বাচ্চাদের খাইয়ে দেয়ায় হাত পা ঝাড়া আছে আমার। আজীজ ভাই বসার ঘরে বসে ঝিমুচ্ছেন- হায়দার ভাই টেলিফোনে কার সাথে যেন স্বাস্থ্য কথন চালাচ্ছেন। সময়টাই এমন; হেলথ, ডিজিজ, ইমিউন সিস্টেম নিয়ে আলাপ আগের চেয়ে বেশী হচ্ছে। বড় বাচ্চাগুলো সারাদিনের স্ক্রিন বিরতির পর আর কোথায়? ডিভাইসের স্ক্রিনেই ঢুকে পড়েছে- ছোটগুলো একতলা দোতোলা সিঁড়ি বাইছে।

মুহুর্তের জন্য মনে হল যদি সময় আটকে যেত এই জানালার কার্নিশে। কারোর যদি বুড়ো হবার তাড়া না থাকতো! আমাদের বাড়ির ফিন রোবটটা চৌকাঠে ধাক্কা খেলে থেমে যায় যেমন সেভাবে থামলেও হয়। না না, সেই থেমে থাকা তো বিষাদের!

ধুলো ওড়ানো বাতাস দমকে ওঠে- নাকি ছলকে ওঠে? এই তো সেদিন ইউংফেরন্সটিগে প্রথমবার পথ ভ্রমণে বের হবার পর ছোট্ট আদীব আইদিদের পেছনে ছোটাছুটি মুহুর্তে দেখা হয়েছিল আজীজ ভাই দীপা ভাবীদের সাথে। কারো চুলে তখনো রূপালী কোন রেখা ছিল না। আবার বধূ বরণের ফুল, মিষ্টির ডালা সাজিয়ে আদনানের বউকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রাখী ভাবী আর পপি ভাবী। সেই নতুন বউটা এখন কোথায় যে গেল!

কে জানে হারিয়ে গিয়েছে কোন চাঁদের হাঁটে!

।।২।।

সময় আটকালোনা। গ্রীষ্মের হঠাৎ ধুলোর বিকেল গড়িয়ে এসে পড়েছিল হেমন্তের হিম সকালে। খয়েরি কমলা বাসন্তী পাতা ছড়িয়ে ছিল মাটিতে। মনে হচ্ছিল অজস্র ঝরে পড়া ডানা প্রজাপতির! আশ্চর্য ভ্রমণের স্টেশনে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই। আমাদের সবার মুখ ঢেকে আছে এক চিলতে সুরক্ষা চেষ্টায়। আমরা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতন দূরে দূরে দাঁড়িয়ে শুনে যাই ইমাম সাহেবের করুণ মোনাজাত। শুধু দীপা ভাবীর হাত ধরতে কেউ না কেউ পালা করে কাছে থাকে।

আমি জমে যাওয়া হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠি। দেখি দুটো কিশোর যাচ্ছে সবার আগে। তাদের কাঁধ খুব ভারী। চুপচাপ তারা কেবল চোখে ভেসে ওঠে হৃদয়ের দহন। আমার চারদিকে রেখে দেয়া জীবন চিহ্ন, কত রকমের পাথর, পাঁশুটে ঘাসের গুচ্ছ। তখন ধলেশ্বরী চিলাই নদীটা আসলে কেমন জানতে ইচ্ছে হল।

দীপা ভাবী হঠাৎ আমার হাত ছেড়ে দিলেন। বিড়বিড় করে বলে উঠলেন করে “ও আদীবের বাপ! যাচ্ছ তা যাও! অপেক্ষা কোরো….. আমি আসতিছি!”

চিলাই নদীর স্বরূপ সন্ধান বাদ দিতে হল আমাকে। এই ভরা হেমন্তে আমি ছেড়ে যাওয়া পত্রবাহারের দুঃখে দুঃখী বৃক্ষদের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত জরুরী কোন ভাষা খুঁজতে লাগলাম।

আরও পড়ুন

সর্বাধিক পঠিত