ঠুল্লো (৩)

১ম পর্ব:

২য় পর্ব:

 

নজরুলের পরীক্ষা দেওয়ার আগের বছরগুলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আরো নাজুক ছিলো। প্রত্যেক পরীক্ষাতেই নকলের মহোৎসব চলতো। এই নকলে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রান্তিক এক কলেজে ভর্তি হয় নজরুল। এমনি প্রান্তিক একটা কলেজ যে কলেজের আশেপাশে একটা চা খাওয়ার দোকানও নাই। লেখাপড়ার পরিবেশও একদমই নেই। শিল্প সাহিত্য, সংস্কৃতির চর্চা করবে এমন পরিবেশ তো সেই কবেই এখানে চাঙ্গোত উঠে গেছে। এখানে সকলে ভর্তিই হয় নকল করে পাশ করার জন্য। কিন্তু বিধিবাম। যেবারে তার এইচএসসি পরীক্ষা সেবার থেকেই পরীক্ষায় নকল করা উঠে গেল। মানে, পরীক্ষায় নকলকারীদের পরীক্ষা থেকে বহিস্কারাদেশের মাত্রা বাড়তে থাকলো। সে কথা ভাবতেই নজরুলের এখনো গা শমশম করে উঠে। শমশম করে উঠার কারণ সে পরীক্ষায় ফেল করার মধ্য দিয়েই তার একাডেমিক পাশ করার সকল স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। অবশ্য এরপরে এক দু’বার পরীক্ষা দিলেও পড়াশুনায় আর মন বসাতে পারেনি নজরুল। এ নিয়ে নজরুলের আক্ষেপের শেষ নাই।
-ক্যা, ইন্টার মিডিয়েটে যেবার তুই এটা সাবজেক্টোত্ ফেল করসিলু, সে এটা সাবজেক্টেই পরীক্ষা দে। তা দিলু নো। আরো ভালো রেজাল্ট করব্যার যায়্যা, আরো বেশি গোঁতা খালু!
সব স্যারই ছাত্রদের আরো ভাল করার জন্যি আরো ভাল পরামর্শ দিবিই! কিন্তু তোর বোঝা লাগব্যার লয় যে, তুই বোঝা উবাবার পারবু না পারবুর লয়। লিজের সিদ্ধান্ত লিজেরই লেওয়া লাগবি। মানষের সিদ্ধান্ত মতো চললে ইংকে করেই বারি খাওয়া লাগবি, বুঝচু!

শিরি তার কৈশোরের বান্ধবী। একসাথেই বড় হয়েছে। এক সাথেই স্কুল, কলেজে পড়েছে। সে একটু মন দিয়ে লেখাপড়া করার কারণে সে এখন অনেক উঁচুতে উঠেছে। অথচ নজরুলের চাইতে সে অনেক কম মেধার ছাত্রী ছিলো সে। সেই শিরিই কিনা আজ কত উঁচুতে উঠেছে। তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে নিজেরই কেমন ছোটো ছোটো লাগে। তার সামনে পড়লে নজরুল কাচুমাচু হয়ে যায়। কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করলে, থতোমতো হয়ে যায়, গলার স্বর আটকে আসে। সে ভাবে-
যে শিরিকে পরীক্ষার খাতা ছাড়ে না দিলে উত্তর লেখপের পায়নি সেই শিরিই আজ ডিসি। তার সাথে দেখা করব্যার চালে, কতো ডেকোর‌্যাম নজরুলকে মেইনটেইন করতে হচ্ছে।
অথচ, এই শিরিরই কতোদিন হাত ধরে কতো পাটের আউলোত ঘুরে বেড়িয়েছে, করলার জমিতে এক সাথে করলা তুলেছে। বিকাল হলেই দৌড়াদৌড়ি করেছে, দড়ি খেলেছে, বউচি, লুডু খেলেছি। আজ সে কোথায় আর নজরুল কোথায়? নজরুল এখনো সেই জায়গাতেই ঘুটুরমুটুর করতেছে। শিরির কথা মনে হলে, বুকের ভেতর হাউমাউ করে কে জানি কেঁদে উঠে। নজরুলের জীবন যে অভিশপ্তময় এজন্য নজরুল নিজেকেই ধিক্কার দিতে থাকে বারবার। কালুর চিমটিতে হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পায় নজরুল। নজরুল দেখে সে এখন জঙ্গলের ধারে বসে আছে। কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার তার সামনে। জোনাক পোকাগুলো কাছে কিংবা দুরে যে আলো জ্বা‌লিয়ে নজরুলকে দেখার চেষ্টা করছে সে আলোয় তার চেহারা দেখার জন্য পরিপূর্ন হয়ে উঠছেনা। নজরুল কালুকে বলে-
বুঝলু, হামরা ইংকে হাই হুতাশ করতে করতেই দেকপু মরে বসে আছি! হামাগেরে কোনো কিছুই পূরণ হবার লয়!
কালু কয়-
একোন এল্লে ভাবে কোনো লাভ হবি? ওল্লে সময় কি আর ফেরত পাবু? সময়ের কাজ হামরা সময়মতো করিনি। লেখাপড়ার বদলে ফিল্ডিং মার‌্যা সময় কাটে দিছি। হামরা ট্যাকাও কামাই করিনি, পড়ালেখাও করিনি, হামাগোরে কপালোত তো; -দুক্কুই লেখা থাকপি।
এল্লে আরো যতোই ভাববু, ততোই মন খারাপ হবি। চ, তার চেয়ে মোমবাতি জ্বা‌ল্যা ক্লাবোত তাস খেলি।
কালুর একথাতে নজরুল ভাবে, তারা যে, জলাঞ্জলিতে গেছে তা আরো পাকাপোক্ত করার জন্য তারা এখনো তাস খেলে, আড্ডা মারে। অযথা সময় এখনো নষ্ট করে। নজরুল ভাবে, এখনো হামাগেরে হুশ হলোনা বার‌্যা!
-কালু কয়,
থো থো, এদ্দিনা হুঁশ আস্যা কি লাভ হবি? হামাগেরে জীবনের গোয়ামারা সারা হয়ে গেছে। চ, যাই, আর কয়দিন আছু, এল্লে লিয়ে চিন্তে করে করে শরীর আরো খারাপ কর‌্যা ফাল্যা দে! এ দুনিয়াত যদ্দিন আছু তদ্দিন খা দা আর ফূর্তি কর। হামাগেরে ওল্লে চিন্তে করে আর লাভ হবিনে। একোন হামাগেরে ছোলপোলোক লিয়ে চিন্তে করা লাগবি!
নজরুল ভাবে, তোরা একেকজন ছোলপোলের বাপ হয়ে গেছু! তোরা তো তাই চিন্তে করবু!
কিন্তু নজরুলের কি হবে? তার তো এখনো বিয়েই করাই হয়নি। ছেলেমেয়েদের চিন্তা তো তার জন্য দুর অস্ত। তাস খেলতে যেতে যেতে নজরুলের অবচেতন মনে খেলে যাচ্ছে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কথা। যে সময় নজরুলকে পথে বসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো। এই সময়টাতে নজরুল যদি একটু ধীরে সুস্থ্যে পরিকল্পনা করতে পারতো তাহলে তাকে আর পেছনে ফেরা লাগতো না।

নজরুল পরীক্ষায় ফেল করার পরও আবার পরীক্ষা দেয়। এবার জেনারেল লাইন থেকে টেকনিক্যাল লাইনে। কিন্তু টেকনিক্যাল লাইন আরো কঠিন মনে হয় তার কাছে। উপরন্ত তার বাড়ি থেকে কলেজটাও অনেক দূর হওয়াতে কলেজ করাটা কন্টিন্যু করা সম্ভব হয়ে উঠেনি নজরুলের পক্ষে। একদম রুট লেভেলের কলেজগুলোতে যা হয়। থাকার জন্য মেস নাই, যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভাল নাই। উপরোন্ত, টাকাও নাই যে, সে নিয়মিত কলেজ করবে। তাহলে, কাছের কলেজগুলো ছেড়ে এতদূরে ভর্তি হওয়ার মানে কি? মানে আর কিছুই না, এই কলেজগুলোতে একটু নকলের সুবিধা পাওয়া যাবে, এই ভেবে, এসব মরচে পড়া- পিঁড়াপিঁড়ি করে ছাত্র ভর্তি করা কলেজগুলোতে ভর্তি হয়েছিল নজরুল।
টেকনিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার পেছনে তার এলাকার এক শিক্ষকের অবদান আছে। সে ঐ কলেজের শিক্ষক। সেই তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে যে, এইখানে ভর্তি হলে, সহজেই পাশ করতে পারবে। মানে, এইখানে নকলের যে মহোৎসব চলে তা মুখে না বললেও তাদের কথাবার্তায় বেশ বুঝা যায়। সে আরো জানায়-
পরীক্ষায় খুব একটা বেশি ইনকোয়েরি হয়না। পরীক্ষার ডিউটিতে হামরাই পড়ি। আর হামি তো আছিই! কুনটিও যদি আটকে যাও তালে পরে হামি কয়ে দিমুনি।
ঐ শিক্ষকের সাহসেই মূলত সে ভর্তি হয় কলেজে। কিন্তু তাকে ভালোই লাগেনা ধৈর্য্য ধরে পড়াশুনা করতে। খালি ছটফটায়- চঞ্চলতা তাকে গ্রাস করে। সে সবখানেই, শটকাটে পুলসিরাত পার হতে চায়। এই শর্টকাট পদ্ধতিটাই পড়াশুনায় কাল হয় তার। মানে, সে কলেজে একদিন গেলে পরের দশদিন বসে থাকে। কলেজের নাম করে বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা হলে রঙ্গিন সিনেমা দেখতে যায়। মিছিল মিটিং করে বেড়ায়। বন্ধুদের সাথে আড্ডা- গল্পগুজবে সারাদিন নজরুলের কোনদিক দিয়ে যে পাড় হয়ে যায় নজরুল টেরই পায়না। এভাবে দিন চলতে চলতে নজরুল দেখলো, সামনের সপ্তাহে তার পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করতে হবে। অনেক টাকার প্রয়োজন হয়, এতো টাকা সে কিভাবে ম্যানেজ করবে? পরিবারের কাছে বলেও সাড়া পায়না।
সারাদিন টো টো কর‌্যা ঘুরে টো টো কোম্পানীর ম্যানেজার হয়ে গেছু, তুই কি পরীক্ষে দিবু?
এরকম নানাপ্রকারের কটাক্ষ, তীরস্কার শুনে শুনে নজরুলের জিউ আরো তিতা হয়ে যায়। সে সিদ্ধান্তই নেয়-
সে আর কোনো পরীক্ষাই দেবেনা বাল!
নজরুলের জীবনের মোড় এভাবেই পাল্টে যায়। কিন্তু এখন সে মনে করে, ইশ্, যদি সেসময় এইরকম ছেলেমিপনা না করতো তাহলে তার জীবনের পরিণতি এমন হতো না। জীবনে কারো আন্ডারওয়্যার হওয়া লাগতো না। ভাল পড়াশুনা করতে পারলে আজ অনেককেই তার আন্ডারওয়্যার করে রাখতে পারতো। এই কথাগুলো মনে হলেই খাঁ খাঁ শূন্যতা দেখা দেয় নজরুলের ভেতরে। কি অমূল্য সময়গুলো কতোই না হেলাফেলা করে কাটিয়ে দিয়েছে নজরুল। যদি সে সময়গুলোতে সময়ের দাম দিতো তাহলে আজকে সে গাড়ি, বাড়ির মালিক হতো পারতো। অনেক উঁচু পোস্টে চাকরি করতে পারতো। কিন্তু তা না করে, সে উচ্ছশৃংখল- নষ্ট ছেলেদের সঙ্গ দিয়ে কত জঘন্যই না হয়ে গেছে! পাড়া প্রতিবেশিরা তাকে দেখলে খারাপ খারাপ মন্তব্য করে। কোথাও বেরুলে, পাড়ার মহিলারা ভয়ে সুলটিতে লুকায়ে পড়ে। ছোটরা তাকে দেখে বলে-
ওদে, মাস্তান আচিচ্চে!

নজরুলের মনে পড়ে, সে একবার রমজান মাসে তার নষ্ট বন্ধুদের সাথে রাতে বেরোয়। উদ্দেশ্য, আজ যাকে পাবে তাকেই এটাক করে পকেট থেকে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেবে।
শৈশবের উত্তেজনায় সে কি গরম হাওয়া। চোখে মুখে ফুটছে মাস্তানির রঙ। হাতে হাতে, দা-কুড়াল। পথিকের পথরোধ করবে বলে সর্বপ্রথমে যে দাঁড়ায়ে আছে, হাতে তার পিস্তল। বেশি টেরিবেড়ি করলে, তার মাথা ফুটো করে দিবে থ্রি নট থ্রি’র একখানি বিচি দিয়ে। কাউকে হ্যাজামোত দেওয়ার জন্য একটা আঙ্গুলের শক্তিই যথেষ্ট;-
এজন্যি গায়োত হাতির লাগানতি শক্তি থাকা
লাগবিনে!
নজরুল জানেনা, বোঝেনা কিভাবে এই কাজগুলো করতে হয়। এই প্রথম সে এসেছে এরকম কোনো অপারেশনে। তাই নজরুলকে এই গ্রুপের লিডার হোসেন বলে,
তোর কিছুই করা লাগবি নে, তুই খালি হামাগোরে সাথে খাড়া হয়ে থাকপু! যা করার হামরাই করিচ্চি। কাকু ছ্যাঁড়াবেঁড়া করা লাগলে হামরাই ছ্যাঁড়াবেঁড়া করিচ্চি!
সেই অল্প রাতে, মানে, মানুষ যখন সবেমাত্র তারাবীর নামাযে দাঁড়িয়েছে তখন নজরুলেরা রাস্তার মোড়ে, ঘাসের উপর বসে তাস খেলতেছে। উদ্দেশ্য, কোনো শিকার যদি পাওয়া যায়! এই রাস্তায় প্রতিরাতেই অনেক শিকার যায়। গ্রামের লোকের হাতে একবার ধরাও পড়েছিলো ডাকাতেরা। সে কি মার, মারের চোদনে প্যান্ট ভরে মুতেছিলো। গ্রামের লোকেরা থানার পুলিশে খবর দিয়ে তাদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু গ্রামের গোয়েন্দা আর স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার চেয়ারম্যানদের জন্য গ্রামের সহজ সরল সাধারণ মানুষেরা তাদের কূটকৌশলের কাছে না পেরে উঠতে পেয়ে তাদের হাতেই ছেড়ে দিতে হয়েছিলো। যারা ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলো, পরে শোনা গেলো, তারা কেউ না কেউ ঐ মেম্বার চেয়ারম্যানদেরই আত্মীয় নয়তো পোষা কেউ। তাদের ইন্ধনেই মূলত, প্রতিরাতে রোডঘাটে চুরি ডাকাতি হয়। ঐ চুরি ডাকাতির অর্ধেক টাকা যায় ঐসব মেম্বার চেয়ারম্যানদের হাতেই। এই ক্ষমতাবানদের কারণেই মূলত, গ্রামে চুরি চামারি হয়, ডাকাতি হয়। এই চুরি, ডাকাতি করতে যেয়ে যদি কেউ ধরা পড়ে তাহলে মেম্বার চেয়ারম্যানরাই তাদের থানা থেকে ছুটে নিয়ে আসে অথবা তারাই দুই একটা চড় থাপ্পড় দিয়ে জনগনের হাত থেকে তাদের মুক্ত করে।

নজরুল সকলের ভেতর থেকেও নিজে নিজেই অপরাধবোধে ভোগে।
এই সময়ে মানুষরা ছওয়াবের কাম করিচ্চে আর হামরা শালা পাপ কুড়োবার আচ্চি!
মনে মনে ভাবে। কিন্তু কিছুই করার নাই
-গ্রুপে যেডে সিদ্ধান্ত হবি সেডেই করা লাগবি। নাইলে সমস্যা হবি। খেলবের নাম্যা এল্লে চিন্তে করলে হবি!
নজরুল যেহেতু আজকের মতো এখানে এসেই পড়েছে সেহেতু তাকে এমন একটা রোল প্লে করতে হবে যে, ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো থাকতে হবে এখানে। যতোই ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো থাকুক নজরুল, গ্রুপের কোনো সদস্য যদি এই কেসে ফাঁসে যায় তাহলে তো নজরুলেরও বদনাম হবি। একথা ভেবে ভেবে নজরুলের গাঁও শিঁউরে উঠে। সে ভালো ফ্যামিলির ছেলে, যদি তার নামে কোনো অপবাদ জোটে তাহলে তার মান সম্মান, ইজ্জত যা আছে তা তো লুটিয়ে পড়বে মাটিতে। কিন্তু এ জাল থেকে আপাতত বের হওয়ার সম্ভাবনা নাই। সে মনে মনে ভাবে, আজ সে বন্ধুত্ব রক্ষা করতে যেয়ে ফাঁইসা গেছে মাইংকার চিপায়! তবু সে সিদ্ধান্ত নেয়, পরবর্তীতে যেভাবেই হোক এ গ্রুপ থেকে তাকে যেকোনো উপায়ে বের হতেই হবে। নাইলে সব মান সম্মান তাদের নিমেষেই ধুলায় মিশে যাবে।
নজরুলদের প্ল্যান ছিলো রাত দশটার পরে অপারেশন চালাবে। এই অল্প রাতে অপারেশন চালালে ধরা খাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে, তাদের লিডার হোসেন বলে। অপারেশন নিয়ে তার বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে। এর চাইতেও বড় বড় অপারেশন করার অভিজ্ঞতা তার ঝুলিতে আছে। সে ভালো করেই জানে কখন কাকে কিভাবে টোপ গিলাতে হবে! এই কাজগুলোতে সে দারুণ শ্যুটার! এসব ফিসফিস করে গল্পগুজব করতে করতেই দেখে আবছা আবছা দেখা যায় পশ্চিম দিক থেকে কেউ না কেউ এদিকে হেঁটে হেঁটে আসতেছে। চারদিকে কেমন অন্ধকার। পিনপতন নিরবতা এখানে। একটা পিঁপড়েরও এখন যদি এই দিক দিয়ে যায় তাহলে তার পায়ের শব্দও টের পাওয়া যাবে। এমনই টু শব্দবিহীন অন্ধকার এই গ্রামের উপর এখন ভর করে আছে। এই পৃথিবীতে যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তখন মনে হয় তার আশে পাশে এমন রুপ প্রকৃতি ধারণ করে বসে। ঐ আবছা আবছা ছায়াটি যখন নজরুলদের কাছাকাছি আসতে শুরু করেছে তখন বোঝা গেলো, এই লোকটি আর কেউ না সারাদিন পরিশ্রম করা লোক। ঘাড়ে দইয়ের ভাড়। সারাদিন দই বিক্রি করে ক্লান্ত হয়ে ঝিঁমিয়ে ঝিঁমিয়ে আসতেছে। নজরুল ভাবে, এরকম একটা লোকের কাছে থেকে যদি টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তাহলো, তার কি হবে? এই অল্প টাকার দিকেই হয়তো চেয়ে আছে তার ছেলেমেয়ে। হয়তো এই টাকা দিয়ে চাল ডাল কেনার পরই হয়তো তাদের পরেরদিনের খাবারের ব্যবস্থা হবে। নজরুল মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, এই কাজটা করা ঠিক হবেনা মোটেও। গরীবের পেটে আর কেউ লাত্থি দিক সে দিতে পারবেনা। যদি কিছু করতেই হয় তাহলে, গরীবের উপর কেনো? এই এলাকাতে কত কত দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোরেরা আছে তাদের টাকা ছিনিয়ে নিতে হবে। যারা গরীবের হক মেরে আজ দালান কোটা বানিয়েছে। কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়েছে। যদি কিছু করতেই হয় তাহলে সদলবলে তাদের কাছে থেকে জোর পূর্বক হলেও টাকা আদায় করা উচিত। যদি সম্ভব হয়, ঐ টাকা থেকে কিছু টাকা এলাকার গরীব দুঃখীদের মাঝে বন্টন করা উচিত। এসব কথা বলার আগেই প্রধান লিডার হোসেন বলে, শিকার আসতেছে, তোরা প্ল্যানমতো রেডি হ!
এমন এক সময়ে দাঁড়ায়া আছে নজরুল, এই সময়ে নজরুলের বলার কিছুই নাই। কিছু বললে, উল্টো তারই ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। অর্থ্যাৎ, বিমানে উঠে বিমান থেকে লাফ মারার সামিল হবে। ফলে, নজরুলকে থেমে যেতে হয় এসব চিন্তা করা থেকে।
নজরুল কাঁপতেছে ভয়ে। শিফনের হাতে বড় একটা রাম দা। রাম দায়ের মুখ বালি ঘুষে পরিস্কার করা হয়েছে। এই অন্ধকারের ভেতরেও চিকচিক করছে রাম দায়ের মুখ! কুদ্দুস বলে,
শিকার যদি টিওর ছাড়ার চিন্তা করে, তালেই ঘাড়োত বসে দিবু!
এবার জোনাকিরা এই অন্ধকারে এই এলাকার চারপাশ আলো দিয়ে অন্ধকারকে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করতেছে। তাদের সামনে প্রাণীকূলের অবশিষ্ট আর কেউ নাই। মাটি এবং শূন্যতার মাঝখানে ঝিঁ ঝিঁ পোকারা একটানে গলামেলে গান গাইতেছে না কান্না করতেছে তা বোঝা না গেলেও প্রকৃতির উদ্দেশ্যে কিছু যে বলতেছে তা বোঝা যাচ্ছে। যেহেতু এ অপারেশনের স্বাক্ষী হতে যাচ্ছে তারা। আর স্বাক্ষী হিসেবে থাকছে শুধু মাটির উপর গজানো ছোট ছোট ঘাসের মুন্ডুগুলা।
শিকার কাছে আসতে না আসতেই একটা খ্যাঁখ করে উঠার সাউন্ড পেলো নজরুল। বোঝা গেলো, শুকটু পেছন থেকে তার গায়ে চাদর দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ফেলেছে। দইওয়ালার হাত থর থর করে কাঁপতেছে- বয়স ৬০ উর্দ্ধো হবে হবে মনে হচ্ছে। তার হাতের যা জোর ছিলো ইতোমধ্যে তা খেয়ে ফেলা হয়েছে। পকেটে কতো টাকাই বা হবে। হয়তো ৩০০ কিংবা ৪০০ টাকা। তার জন্য! মাত্র তার জন্য! হোসেন যখন দইওয়ালার পকেট থেকে টাকা বের করে তখন তার মুখ দিয়ে শুধু এই কথাটাই বের হচ্ছিলো,
এডে কিস্তির টাকা বার‌্যা;
-এডে কিস্তির টাকা বার‌্যা!
কাল কিস্তিওলাক দিবের না পালে হামার এই সুরুত আর সুরুত থোবার লয়!
হামার বউ বেটিক উদ্দেশ্য করে মুখোত যা আসপি তাই কয়ে যাবি কিস্তিয়ালারা।
ল্যান না বার‌্যা! ল্যান না!
:চুপ শালা! আবার কথা কচ্চু! দিনু কলে বসে!
অগত্যা চুপ হয়ে যায় দইওয়ালা। তার সারাদিনের রোজগার করা টাকা দুই মিনিটেই চলে আসে নজরুলদের পকেটে। মুনাফাখোর, বুর্জোয়ারা যেভাবে বুদ্ধি খাটিয়ে গরীব শ্রমিকদের শোষণ করে মুনাফা লুটিয়ে নেয় দু’মিনিটেই! নজরুলের মনে হচ্ছে তারাও এভাবে অন্যের টাকা নিজের পকেটে নিয়ে নিচ্ছে। শুধু পদ্ধতিটা আলাদা।
টাকা ছিনতাই করার পর নজরুলেরা সবাই দৌড়ে এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় যায়। আর পরখ করার চেষ্টা করে যে, কোথাও কোনো হৈচৈ হচ্ছে কিনা। গ্রাম থেকে গ্রামে ডাকাত ডাকাত বলে কেউ টিউর ছাড়ছে কিনা। সবকিছুই ঠিকঠাক মতো হলে, তারা সবাই নিরাপদ স্থানে এসে টাকা ভাগাভাগি করে নেয়। কিন্তু নজরুল নেয় না সে টাকার ভাগ। বলে,
না হামি এই টাকার ভাগ নিমুনা। তোরা নে!
নজরুল আসলেই বোকা কিসিমের। শুকটু বলে,
কেরে লিজের ভাগ কেউ ছাড়ে?
কিন্তু নজরুল আলাদা। সে নেবেনা এই টাকা।
পরেরদিন গ্রামে এর অর মুখ থেকে শোনা যায়, কাল গ্রামে ডাকাত পরিসলো বারে। এক দইওয়ালাত থেকে টাকা কাড়ে লিছে। পরে ঐ দইওয়ালা নাকি নিজ গ্রামের রাস্তা ভুল করে রামেশ্বরপুরে চলে গিয়েছিলো। হায়! মানুষ কতোটা শকট পেলে নিজের রাস্তাটাও ভুল করে আরেক পথে চলে গিয়ে নিজেরই পথ হাতরাতে থাকে!
নজরুল গতরাতের ঘটনাতে নিজে নিজেই খুব অনুতপ্ত হয়। দুঃখ করে। সঙ্গী সাথীদের ভুল সিলেকশনে নজরুল কোন পথে পা বাড়িয়েছিলো, ভাবা যায়? সামান্য একটু অর্থনৈতিক মুক্তি পাওয়ার জন্য নজরুল কত কিই না করেছে। গ্রামের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে সে স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। নিজের জীবিকার প্রয়োজনে সে অনেক কাজই করেছে যেগুলো তার করার কথা না। নজরুলের জীবনের অনেক সময় অহেতুক কাজে ব্যয় হয়েছে যা তাকে তার জীবনের আসল কাজ থেকে দুরে রেখেছে। গ্রামের রোগী নিয়ে আজ এর সঙ্গে হাসপাতালে তো কাল ওর সঙ্গে যায় ক্লিনিকে। যাকে বলে বেগার খাটা আর কি। বেগার খাটলেও অন্তত দিনগুলা পার করা যেতো অন্যের উপর ভর দিয়ে। মানে, বন্ধুবান্ধবদের সাথে চলতে পারলেই বিড়ি, সিগারেট, চা পান সহ দুপুরের খাবার জুটে যেতো। এ পেশার ভেতর ভবিষ্যত পাওয়া না গেলেও অন্তত বর্তমানকে পাওয়া যেতো। ফলে, প্রত্যেকদিনই সকাল হলেই বন্ধুবান্ধবদের যার যে কাজ থাকে ডাক দিলেই বেরিয়ে পড়তো নজরুল। নজরুলের কোনো কাজ নেই শুধু তাদেরকে সাপোর্ট দেয়া ছাড়া। সাপোর্ট মানে, তাদের সঙ্গে থাকা। কেউ থাইগ্লাসের কাজ করতো, কেউ মুদি দোকানদার ছিলো, কেউ রডসিমেন্টের ব্যবসা করতো, কেউ রাজনীতি করতো, কেউ বা করতো সমিতির ব্যবসা। নজরুলের কাজ হতো শুধু তাদের সাথে থাকা। নজরুল তাদের সাথে থাকলে তাদের মনোবল বাড়তো। এভাবেই কেটে যেতো দিন রাত, সপ্তাহ, মাস, বছরের পর বছর। কিন্তু এভাবে সময় পার করে দেওয়ার ভেতরও নজরুল নিজেকে নিয়ে চিন্তা করতো। নিজের স্বপ্নকে যে লালন করে তাকে কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং এই গভীর খাদ থেকে উঠে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াবে কিভাবে তার চিন্তা করতো সবসময়।

ভান্ডারপাইকার একটা গ্রাম। এই গ্রামটি বাংলাদেশের আর দশ পাঁচটা গ্রামের মতোই। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। গ্রামের এক সাইট দিয়ে বয়ে গেছে নদী। এই গ্রামে ছোটাকারে খুপরির মতো ঘর আছে অনেক। তার উপর দিয়ে দুই একটা টিন চালওয়ালা বাড়ি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আম কিংবা জাম গাছের উচ্চতার সাথে টক্কর দিতে চায়। এই গ্রামের ম্যাক্সিমাম মানুষের পেশাই কৃষিনির্ভর পেশা। দিন আনে দিন খায় তারা। শহরের অর্থনীতির তুলনায় এ গ্রামের সবাইকেই বলা যায় প্রলেতারিয়েত শ্রেনীর দলভূক্ত। একটু যারা স্বাচ্ছন্দ্বে থাকে তারা দুই এক বিঘা জমির মালিক। তারাই এ গ্রামের ধনীক শ্রেনীর। এর বাইরে আরো দুই এক পেশার ধনীক শ্রেনী আছে যারা গ্রাম থেকে গিয়ে সৌদি আরব, কুয়েত কিংবা মালয়েশিয়াতে থাকে। তাদের কাছে কাঁচাপয়সা থাকার কারণে তারা খুবই সম্মানিত হয় গ্রামে। এ শ্রেনীর কেউ বিদেশ থেকে এলে গ্রামের মুরুব্বি কিংবা যুবক শ্রেনীর লোকেরা মাচান কিংবা বেঞ্চিতে বসে খুব উৎসাহ সহকারে তাদের গল্প শোনে। ওখানে তারা গণশৌচাগারের চাকুরি করলেও এখানে এসে গল্প করে বেড়ায় তারা হ্যাং ত্যাং করা লোক। সেলুনে চুল কাটলেও এখানে গল্প করে তাদের ওখানে একেকজনের নিজস্ব বিল্ডিং আছে। কেউ বড় ব্যবসায়ীর কথা বলে। গ্রামের লোকেদের বলে, তাদের সাথে মাসে একবার হলেও সৌদিআরবের প্রিন্স দেখা করতে আসে।
হামাগেরে অনেক উঁচো উঁচো লোকের সাথে সম্পর্ক, বুঝছো!
এ সমস্ত কথা শুনে গ্রামের ছোট ছোট উঠতি যুবকেরা আরো উৎসাহী হয়।
হাতোত সময় নাই, আরেকদিন গল্প করমো হিনি বলে হুন্ডোত টান দিয়ে হোঁ হোঁ করে পাড়া কাঁপাতে কাঁপাতে চলে যায়। ছোট ছোট ছেলেরা অপেক্ষা করে কখন শহর থেকে তাদের প্রাণের বড় ভাই গ্রামে ফিরবে এই আশাতে রাত গভীর হলেও বসে থাকে। যদি তার সাথে মিল দিয়ে একটা ভিসা পাওয়া যায় তাহলে তো কথাই নাই। নিজেরও গুঁটি ফিট হয় তাহলে। কেননা, তাদের কাছে ঐ বিদেশ থেকে ফেরা লোকজনেরা একেকজন মডেল হয়ে যুবক শ্রেণীর অন্তরে মিশে গেছে। তাদের মনেও বাসনা, তারাও একদিন বিদেশ গিয়ে এরকম দেশে ফিরে এসে গায়ে সেন্ট মেখে ঘুরবে আর লেকচার দিয়ে বেড়াবে! মাঝে মাঝে দুই একটা আরবী কিংবা ইংলিশ ঝারে দিয়ে লোকেদের আরো টাসকি মার‌্যা দিবে! গ্রামের লোকেরা বিস্ময় প্রকাশ করবে। গ্রামের লোকেদের যতবারই বিস্মিত করতে পারবে ততোবারই তারা আরো মাথাত লিয়ে লাচপে! মোবাইলে বিদেশে তোলা দুই একটা সাদা মেয়েদের ছবি তোলা থাকবে, তা দেখায়ে এই গ্রামের বিদেশ না যাওয়া বন্ধুদের বলবে,
এরি গেরে সাথে হামার ম্যালা সম্পর্ক। কত কি করছি…।
যাতে সেই বন্ধুরা বিদেশ না যেতে পারার জন্য আফসোস করতে করতে যাতে কষ্ট পেতে থাকবে। মোট কথা, গ্রামের হেড তারাই হয়ে থাকে। কাঁচা টাকা হাতে থাকার কারণে কাউকে টাইমও দিতে চায়না তারা। তাদের উদ্যমী ভাব আর টাকার গরমে কেউ তাদের সাথে পাল্লাও দিতে যায়না। তারা যদি বলে এই গ্রামে কাল থেকে ঘুঘু লাচপি! তাহলে তাই। কারো টুঁ শব্দ করার সাহস নাই। ফলে, এই ভান্ডারপাইকা গ্রামের যুবকদের সামনে তাদেরই মডেল হয়ে থাকা স্বাভাবিক। গরীব মানুষেরা তাদের অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়লে উদ্ধার তাদেরকেই করতে হয়। এই গ্রামের যত বড় বড় মজলিস হয় তারা ছাড়া অতো বড় বড় মজলিস করার সামর্থ্য রাখেনা আর কেউ।
নজরুলের তেমনই এক শৈশবের বন্ধু নাদিম মালয়েশিয়া থেকে ফিরে এলে নজরুলকে দেখে দেখে আরো কত কত কথা বলে।
কি রে, ভোম্বল! এখনো ঠুল্লোই থাকলু?
কোনো কামোত লাগবের পারলু নো।
ইংকে করে যে বসে আছু, হামাকও তো একদিনও কলু নো যে, হামাক এটা ব্যবস্থা করে দে! হামি কি তোর কুনুদিন ক্ষতি চাছি লিকিন?
নজরুল মনে মনে ভাবে,
কত বন্ধুক দেকনো, গোয়ার কাপড় খুলে লেওয়া ছাড়া তারা আর কিছুই করেনি!
সেসব মুখ ফুটে বলেনা যদিও তবু নাদিমের চাইতে যে বন্ধু নজরুলের কাছের তাকে সব খুলে বলার পরও কোনো হেল্প করেনি। বরঞ্চ, গোয়ার মধ্যে আরেকটা বাঁশ ঢুকে দিয়ে থোছে! আর তুই তো তুই!
কেউ কারো লয় রে, হামরা যে সময়োত এক সাথে ঘুরছি-খেলছি সে সময়ে কেউ আমরা নিজের স্বার্থ দেখিনি। এখন আমরা বড় হচ্ছি, আমাদের চাহিদা বাড়ছে, আমরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত আধিপত্য বজায় রাখার জন্য যার যেটুকু ক্ষমতা আছে তার ব্যবহার করে একে অপরকে ঘায়েল করার খেলায় আছি। যাতে, নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে পুরা এলাকাটা!
ঐ আগলে দিনের কথা আর কসনে বন্ধু! তুই ভালো আছু- আরো ভালো থাক এই দোয়াই করি
-নজরুল নাদিমকে বলে! তবু মন ফিরে ফিরে ঐ নব্বই দশকের দিকেই চলে যায়। নজরুল যতোই বলুক, অন্য বন্ধুরা যতোই নিজ স্বার্থের টানে কূটকৌশলের আশ্রয় নিক তবু সেই ফেলে আসা সময়ের দিকে সবাইকেই টানে! আহা, কি রঙ্গীন ছিলো সেসব দিন। নজরুলের মনে পড়ে, তাদের বন্ধুদের দিনের বেলায় যার যতোই কাজ থাকুক না কেনো সন্ধ্যা হলেই ঐ ত্রিমোহনীতে একত্রে সবাই মিলিত না হলে কারো প্যাটের ভাত হজম হয়নি, কখনো। ঐ আড্ডায় একদিন যদি কেউ না আসতো তার খবর তারা সাথে সাথেই কালেক্ট করতো। তাদের বিপক্ষে এই গ্রামে অন্য কেউ অন্য কোনো গ্রুপে তৈরি করবে এটা অসম্ভব। বলা যায়, এরাই এই এলাকার আগামী দিনের হর্তাকর্তা। নজরুলদের সামনে কেউ ফাল মেরে কথা কবে, তার চান্স নাই কারুরই! একবার তাদের সমবয়সী এক বন্ধু চেষ্টা করেছিলো ভিন্ন গ্রুপ তৈরি করার। কিন্তু তাকে এমন ছেংটা দিয়েছিলো নজরুলেরা যে, পরবর্তীতে ভিন্ন গ্রুপ তৈরি করার কথা তো দুরে থাক; বাপ মায়ের নাম পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিলো!
নিজ গ্রামে যা হতো তা নজরুলের নেতৃত্বেই হতো। এক সাথে তাস খেলা থেকে শুরু করে একসাথে দলবেঁধে নদীতে নৌকা ভ্রমন, নদী থেকে মাছ ধরে এনে পিকনিক করা থেকে শুরু করে শৈশবীয় সব আনন্দই উপভোগ করেছে তারা। বলা যায়, নজরুলদের শৈশব, কৈশোরের দিনগুলো অনেক সমৃদ্ধ।
রাতের আঁধারে গ্রামের শৈশবীয় যতো ছোটখাটো অপরাধ ছিলো তা তারা করে বেড়াতো। এর ভেতর দিয়ে তারা জীবনের আনন্দ লাভ করার চেষ্টা করতো। যেটাকে অপরাধ বলা যায় না, কোনোক্রমেই! যেমন, কাউকে গাছে উঠিয়ে দিতো ডাব গাছ থেকে ডাব পাড়ার জন্য। সে ডাব পেরে নজরুলেরা খাইতো রাতের আঁধারে। কোনো কোনো রাতে এত ডাব পাড়তো যে, সব ডাব খেতে পারতো না সবাই।
তখন কেউ কেউ সে ডাবের পানি দিয়ে হাত, মুখ ধৌত করতো কেউ বা টয়লেটে বসে এই ডাবের পানি দিয়েই শৌচকর্ম চালাতো! কোনো কোনো রাতে তালগাছ থেকে তালখুর পেড়ে এনে খাইতো। এভাবে শসার ক্ষেত থেকে শসা, কলার বাগান থেকে কলা এরকম টাটকা খাওয়ার উপযোগী এমন কোনো ফলফলাদি নাই যে মনের আনন্দে চুরি করে খেতোনা তারা।
নজরুল আর নাদিমদের এই স্মতিচারণের মাঝে গ্রামের ষাটোর্দ্ধ এক মুরুব্বী বলে,
তোরা আর কি খাছু, হামরা যা খাছি তা তোরা চাখেও দেখিসনি! খাওয়া তো দুরের কথা! এই হিন্দুপাড়ার বউদি, দিদিমা’রা বড় বড় কড়াইয়োত করে দুধ জ্বাল করিচ্চিলো- হামরা খেরির ঘরের বাইরে থেকে শিন্টে দিয়ে চুঙ্গুর মেরে দুধ খায়্যা ছাপা কিরকিরে করে ফ্যালেছি কতো!
আমগাছ, জামগাছ, বেলের গাছোত থেকে ফলগুলো পাক্যা মাটিত পড়ে থাকিচ্চিলো। খাওয়ার লোক নাই। ল্যাপাড্যাপা!
কে খাবি? সগলির বাড়িতই তো সবই আছে। তুরিগেরে লাগানতি- তোরা তো কিছুই পাসনি লাতি, হামরা যা করসি তা তোরা সারাজীবনেও করবের পাবুর লয়!
লদীত যদি একবার তৌড়জাল দিয়ে খেও দিছু- তো বড় বড় বোল মাছ, ফলি মাছ, কাতল মাছেরা জালের সাথে উঠে আসিচ্ছিলো।
সেগলে দিন কি আর আছে লাতি?
এখন তোরা যেল্লে খাচ্ছু সেল্লে দুই নম্বর; ফরমালিনে ভরা। এটা আপেল, কমলা কিনে খালেও ফলের পরিবর্তে বিষ খাচ্ছু।
আর হামরা অরিজিনাল গাছ পাকা ফল খাছি। একথার পরপরই ষাটোর্দ্ধ মুরুব্বি অন্য মনস্ক হয়ে বলে,
এখোন দিনসমিও ভাল লয়, কারু গাছোত থাক্যা যে কিছু পাড়ে খাবু সিংকে সময় লয়। যে দিন পড়ছে বারে- কারু সাচোত এনা পানি পড়লেই ছ্যাঁত করে উঠে! গরম তোউলোত ঠান্ডা পানি পড়লে যিংকে হয় সিংকে। সগলির চান্দি গরম থাকে বারে। কেউ এনা সবুর করেনা।
নজরুল বলে, ইংকে পরিস্থিতি হছে, গত ইলেকশনোত থাক্যা। চেয়ারম্যানেরা যখন মারে পিটে ভোট চুরি করে লিলো তখন থাক্যাই ইংকে!
একথা বলার পরই ষাটোর্দ্ধ মুরুব্বি অন্যদিকে তাকিয়ে থেকে স্মৃতি আউরাতে থাকে। স্মৃতিতে ভেসে উঠতেছে আগুন, আগুন! এতো রাতে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় প্রথমে ভ্রম বলে মনে হচ্ছিল পাড়ার বয়স্ক চাচার। গায়ে চিমটি কেটে ভাবে সে কনশাসই আছে তো। না ভুল শুনতেছে না। বেড়ার ধারে কান খাড়া করতেই অনেক লোকজনের সমস্বরে ঊল্লাউল্লি।
হিন্দুগেরে বাড়িত আগুন লাগছে বারে-হিন্দুগেরে বাড়িত আগুন লাগছে!
ও কালুর মাও উঠ্ উঠ্, -হিন্দুগেরে বাড়িত আগুন লাগছে!
হাইরে, ওরিগেরে একনাই এনা খেড়ির ঘর। ওই খেড়ির ঘরোতই বাপ, মাও, সোলপোল লিয়ে শুতিছছিলো। সেটিই আগুন লাগলো বার‌্যা!
অনেকেই জানে এই আগুন লেগে ঘর পুড়ে যাওয়া এটা নিছকই কোনো দুর্ঘটনা। কিন্তু কালু বড় হয়ে জানছে এই আগুন দিয়ে ঘর পুড়ে দিছে তারই এলাকার ক্ষমতাবান কিছু লোক। উদ্দেশ্য আর কিছুই না। গত নির্বাচনে তাকে মুখের উপর বলে দিয়েছে, আর যাই হোক এইবার তোমাগোরক আর ভোট দিমুনা। তারই খেসারত দিতে হইছিলো কালুর বাপেগোরক! কিন্তু ফুলবানু এখনো ঘুমের ঘোরে দেখে তার ছোট ভাই আগুনে পুড়ে যাচ্ছে, হাত পা ও নাড়ছে, চামড়া পুড়ে গা থেকে তেল বের হচ্ছে। একটা উৎকট গন্ধে নাক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ফুলবানুদের। ফুলবানুর মা, হায় ভগোবান হায় ভোগোবান বলে বুক চাপড়াচ্ছে! আর ফুলবানুর বাপ খেড়ি ঘর থেকে দূরে আমগাছ ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর অভিশাপ দিচ্ছে, তারই ছোট দাদাকে। যে গতকাল জমির আল কাটতে বাধা দিয়েছিল।
-ক ভাই, ইংকে আজনীতি করলে ক্যাং করে দেশের মানুষ ভালো থাকপি!

নজরুলেরা নানান রকম আনন্দ ফুর্তি করে থাকে যৌবন, কৈশোর এবং শৈশবকে উপলব্ধি করার জন্য। অপূর্ব সেসব দিন ছিলো। রঙীন দিন। সোনালী দিন। তবে হলুদ দিন ছিলোনা!
একদিন হলো কি নজরুলেরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলো যে, আজকে পুরা গ্রামেই জামাই ষষ্টি দেবে তারা। যেই ভাবা সেই কাজ। যার গাছে যা আছে মানে সেই গাছ থেকে তা তা পেড়ে আনে, রাতে। সেই ফলগুলো, যথা, আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, কাঁচাকলা সবার গেটের সামনে এক পিস করে রেখে দেয়। আঞ্চলিক ভাষায় তাকে আমাদ দেয়া বলে। অর্থ্যাৎ, নতুন কারো বিয়ে হলে পরের বছর থেকে শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রতি বছর জামাইয়ের বাড়িতে নতুন বছরের সব নতুন ফল দেয়াটাই আমাদ এর কালচার বলে পরিচিত। নজরুলদের সেই আমাদ দেওয়ার ইচ্ছেটা যে কেনো হলো তা তারা জানেনা। কিন্তু এটা যে তাদের শৈশবের উড়ন্ত উচ্ছ্বাস- তা নজরুলদের কার্যক্রম দেখলেই বুঝতে পারবে, লোকে। পরদিন সকাল বেলা গ্রামে হৈ হৈ কান্ড রৈ রৈ ব্যাপার। এগুলা কে করেছে, কারা করেছে তা তাদের লিস্ট করলো গ্রামের মুরুব্বিরা। তো নজরুলকেই মেনশন করে বলা হচ্ছে যে, এই চৌধুরী ব্যাটার সাহসেই সগলি এল্লে­ কাম করছে! ওর ইন্ধন ছাড়া এল্লে কাম কেউ করবের সাহস পারলোনাহিনি!
-হ, খালি চৌধুরী ব্যাটারই দোষ?
আরেকদিক থেকে আরেক মুরুব্বি শ্রেনীর বলে।
ওরা যদি না গেলোহিনি তালে পরে উই একা পারলো হিনি!
-ক্যা বারে আকালু, তুই যদি হামার সাথে না যাস হামি তোক সাথে লিয়ে যাবার পামো কোন্টিও?
আর তুই কলিই হামি যামু নিকি? হামার লিজেরও তো জ্ঞান বিবেক আছে -তা লোয়?
গ্রামের সবচেয়ে চৌকস আর বড় মুরুব্বি লোক আকরাম চাচা বলেঃ
আজ সন্ধের সমি সগলিকি স্কুলের ফিল্টোত এটেন্ড করা তোরা। আজ বিচের বসপি। যারা এল্লে কাম করে তারা ক্যাং করে ভালো মানুষ হবি বারে? আজ এরিগোরক এনা শিক্ষে দেওয়াই লাগপি।
কি কও বার‌্যা মুনজু?
হ চাচা, ঠিকই কছেন, এরিগোরোক এনা হ্যাজামোত দেওয়াই লাগপি! এরা খুব ব্যার বারিছে!
আকরাম চাচা বলে,
তালে ওডেই কথা থাকলো- হেন্দু, মোসলমান যাই যেটিই থাকো বার‌্যা, সন্ধের সমি এই স্কুলের ফিল্টোত তোমরা সগলি আসো।
এরপর মহাচিন্তায় পড়ে নজরুলসহ নজরুলের সহপাঠীরা। কেউ অন্য পাড়াত যায় লুকাতে, যার বাবার টাকা পয়সা একটু বেশি সে বাড়ি থেকে ১০০/১৫০ টাকা চুরি করে দুইতিন দিনের জন্য আশ্রয় পেতে শহরের নিকটাত্মীয়দের কাছে চলে যায়। আর যাদের টাকা পয়সা কম তাদেরকে গ্রামে থেকেই এ সংকট মোকাবেলা করতে হয়। এর ভেতর আবার শুরু হয় নতুন রাজনীতি। নজরুলদের চাইতে কিছুটা সিনিয়র বড় এক ভাই আছে সে এই রাজনীতি করা শুরু করে দিলো। মানে, নজরুলদের ঠেকাতে সেই কলকাঠি নাড়তে শুরু করলো। গ্রামের ঐ বড় ভাই নজরুলদের গ্রুপ বিভক্ত করার জন্য নজরুলদের ভেতর থেকেই দুই তিন জনকে ডেকে বলে যে,
সব দোষ ঐ চৌধুরী ব্যাটার ঘাড়ের উপর ফাল্যা দিবু! মিটিংয়োত অর নাম না কল্যা তুরিগেরে পিঠের চামড়া থাকপের লয় একটারো।
ঐ বড় ভাইয়ের নজরুলের প্রতি রাগ, বিদ্বেষ অনেক কারণে। এলাকায় নজরুলের জনপ্রিয়তাই মুল কারণ। সে এলাকায় গরীবদের মাঝে এতো অর্থ সম্পদ দান করার পরও তাকে কেউ পোঁছেনা। অথচ, নজরুল কাউকে একটাকাও দেয়না, নজরুলের কাছে থেকে কেউ কিছু পাবে এই আশাও নাই কারো; তারপরও নজরুল এলাকায় জনপ্রিয় ছেলে হওয়ার কারণেই মূলত এই শত্রুতার কারণ। একারণে নজরুল যেখানেই বিপদের সম্মুখীন হয় ঐ বড় ভাই সেখানে গিয়েই নজরুলের বিরুদ্ধে আঠা লাগায়। কিন্তু নজরুলের সাথে পেরে উঠে না কখনোই।

 

অনেকদিন ধরে বসে থেকে থেকে দিন পার হয় নজরুলের। পকেট শূন্য থাকায় বাড়িতেই থাকতে হয় তার; আর বাইরে বেরুলেও বাড়ির সামনের রাস্তা পর্যন্ত তার দৌড় থাকে। টাকার অভাবে চা- বিড়ি কোনোটাই খেতে পায়না সে। দোকানে বাকি খেতে খেতে একেকটা দোকানে হাজার টাকার উপরেও বাকি হয়ে গেছে। এভাবে কতদিন চলবে?
এক দোকানে যখন ১ হাজার টাকার উপরে বাকি হয়ে যায় তখন আরেক দোকানে বাকি খাওয়া শুরু করে। লোকলজ্জ্বার কারণে ঐ দোকানের আশ পাশ দিয়ে যায়ও না নজরুল। যদি লোকজনের সামনেই দোকানদার বাকি টাকা চেয়ে বসে তাহলে তার ইজ্জ্বত পাংচার হয়ে যাবে যে! এমনিই তো সে বেকার। দোকানে এত টাকা বাকি আছে একথা জানলে পরিবারের লোকজন তাকে ছেড়ে কথা বলবে না। এছাড়া বাইরের লোকজন বলাবলি করবে, কানাঘুঁষা করবে।
এই সোল ক্যাং করে চলে বার‌্যা! হামরা দিনোক রাত আর রাতোক দিন করে গায়ের ঘাম পানি করে ট্যাকা কামাই করেও হামাগোরে চলেনা তালে পরে নজরুল ইংকে করে বসে থেকে ক্যাং করে চলে বার‌্যা?

অনেকদিন হলো নজরুলের ফ্রিল্যান্সিং কোনো কাজ কামও নাই। নজরুলের কাছে ফ্রিল্যান্সিং কাজ মানে, অন্যের কাজ এগিয়ে দেওয়া বোঝে, মানে অন্যের কাজে সহযোগিতা করাকে বোঝে। আরো সহজ করে বললে, নজরুল যে রাজনৈতিক দল করে সে দলের কোনো হয়ে কর্মসূচীকে সফল করাকে বুঝাতে চায়। এবং ঐ রাজনৈতিক দলের নতুন কোনো কর্মসূচী না থাকায় তার আয় রোজগার বলতে যা হয় তাতে ভাটা পড়ে।
নজরুল দলীয় উর্দ্ধতন নেতাদের নির্দেশে রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন করার জন্য লোকজন ভাড়া করে নিয়ে গিয়ে তা থেকে যা পেতো তা দিয়ে তার ভালই চলতো। এখন বিরোধী দল মাইংকা চিপায় থাকার কারণে তার দলের রাজনৈতিক কর্মসূচী নেই বললেই চলে। ফলে, রাজপথ দখল করার জন্য, মিছিল মিটিংয়ের জন্য কোনো লোকজনকে ভাড়া করতে না পারার দরুন তার অর্থনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। আর একারণে তার পকেট খরচের টাকাটাও হাতে থাকেনা মাঝে মধ্যে।
নজরুলের পকেট খরচের টাকা হাতে না থাকার দরুণ মনটোনও কেমন উদাসীন থাকে তার। এদিকে সালেক কাকার কাছেও গাঁজার টাকা বাকি হয়ে গেছে অনেক। সালেক কাকা, চাপ দেয়! কে বার‌্যা ট্যাকা দিবে কোদ্দিন? বাকি খাত্যা খাত্যা তো খাতার পৃষ্টায় শেষ হয়ে গেছে তো। হামার ব্যবসাটাত লাল বাতি জ¦লাবা নিকি? তোমাগোরে অত্যাচারে হামি ব্যবসাও করব্যার পারমুনা মনে হচ্ছে। ইংকে করে দুই চারজনোক বাকি দিলেই হামার ব্যবসা তো লাটোত উঠপি বার‌্যা। জোর করে কিছুই কলেই তো পুলিশোক দিয়ে ধরে দিবেনি। তখন হামার আমও যাবি ছালাও যাবি! এ জন্যি কিছু কইনে। তারমানে আবার এডেও ভাবো না তোমাগেরে ভয়োত হামি কাঁপি! উংকে ম্যালা নজরুল এখন হামার কাছে পান্তাভাত! তোমাক ছোটোতথিনি ভাল লাগে বলে কিছু কইনে, যে বাপু এখন কাজকাম নাই, কাজকাম হলে পরে ঠিকই দিবি। কিন্তু তুমি যা আরম্ভ করিসো, তাতে হামার সমস্যা হচ্ছে বা। তুমি কিছু করোনা, ট্যাকা চালে ট্যাকাও দিবা না। আবার হামি যদি আরাত করবের কই, সেডেও করোনা। তোমার মান খালি আছে, হামাগোরে নাই মনে হচ্ছে। তুমি যাই করো বাপু, তারাতারি হামার বাকি ট্যাকা গুলো পরিশোধ করে দাও। নজরুল বলে, দিমু বার‌্যা সালেক কাকা, তোমার ট্যাকা মার‌্যা খায়ে হামি উড়ে যামুনিকি! এনা সমস্যা হচ্ছে, ইংকে সব সময়ই হবি। দল মিটিং মিছিল দিলে তোমার ট্যাকা পরিশোধ করতে হামার একদিনও লাগবের লয়। কিন্তু, দিন যায় মাস যায় নজরুল নতুন করে কোনো কাজ পায়না। এদিকে এলাকায় বড় কোনো সমস্যাও হয়না কারো যে, সে সমস্যা সমাধান করে একটা বড় নজরুলের পকেটে ঢুকবে। নজরুলের ভেতরে ভেতরে একধরণের অস্থিরতা চলতে থাকে, টাকার প্রবলেম সলভ করতে চায়। এই সমস্যার ভেতর আবার সংসার থেকেও চাপ আসতে থাকে। এভাবে কদ্দিন। কিছু না করলে সংসার চলবে কিভাবে? সবদিন থেকেই নজরুল চাপে পড়তে থাকে। কথায় আছে না, যখন সমস্যা হয় তখন সবদিককের সমস্যাই একবারে চাপ দিতে থাকে। নজরুলের এখনকার পরিস্থিতি এমন। ফলে, নজরুলের পক্ষে এখনকার দিনগুলো সারভাইব করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। একদিকে পাওনাদারদের চাপ আরেকদিকে সংসারের চাপ এবং নজরুলের কিছু করতে না পারার ব্যক্তিগত চাপ এই ত্রিমুখী চাপে নজরুল ক্রমেই চেপ্টা হয়ে যেতে থাকে।
নজরুল সমস্ত চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ঝিঁমিয়ে যেতে থাকে। তবু যখন গাঁজা খাওয়ার বিগেড় উঠে তখন নজরুলকে থামানো কঠিন হয়ে পড়ে। ছট্ফট্ করে। এক স্টিক গাঁজা না খাওয়া পর্যন্ত সে ছট্ফটানি থামেনা! কিন্তু এই এক স্টিক গাঁজা খেয়ে তার কি চলে? আরো চুলকানি শুরু হয়। আরো খেতে লোভ হয়। নজরুল মনে করে এভাবে একা একা গাঁজা টানার ভেতর আনন্দ নাই। একা খাইলে আরো নির্লিপ্ত হয়ে যেতে হয়। এই মদ বলেন আর গাঁজা বলেন একা খাওয়ার জিনিস না। সবচেয়ে ভাল হয় আসর জমিয়ে খেতে পারলে। অর্থ্যাৎ, গাঁজাগুলোকে কেটে কেটে তার সাথে আরো এক প্রকারের পাতা মিশিয়ে একটা বড় কল্কিতে তুলে খেতে পারলে অনেক তৃপ্তি পাওয়া যায়। জগতকে সাঙ্গ করা যায়। এছাড়াও একটা আসরে বসলে সকলেই গাঁজা কেনার টাকা দিতে না পারলেও সমস্যা হয়না। মোটের উপর থেকে ম্যানেজ হয়ে যায়। মানে, সবাই দুই একজন দুই একদিন কেউ টাকা দিতে না পারলেও গাঁজা খাওয়া থেমে থাকেনা তাতে। এতে আসর বসিয়ে খেলে কারো পকেটে টাকা না থাকলেও রেগুলার খেতে পারে। আর এগুলা মানুষের সামনে আসল মাল ছাড়া দুই নম্বর মালও দিতে পারেনা। কেউ না কেউ খপ করে ধরে ফেলবে। কেননা, সবাই গাঁজা খেতে খেতে এমন চেনা চিনে ফেলেছে যে, গাঁজা বিক্রেতা পকেট থেকে গাঁজা বের করা মাত্রই বুঝে ফেলে এটা পাটগ্রামের মাল না অন্য জায়গার। এছাড়াও গাঁজা বিক্রেতা নিজেই আসরগুলোতে খায় বলে, অরিজিনাল মালই দেয়। টাল্টিবাল্টি করেনা। ফলে, যা খায় তা খাঁটি মালই খায়। আর একলা খেলে, ১০০ টাকার পোটলা দুই ভাগ করে ১০০ টাকা করে বিক্রি করে। আর দুই নম্বরি মালও মিক্সড থাকে। যাকে খেয়ে অরিজিনাল নেশাটা হয়না কারো। প্রতিবাদ করারও কিছু থাকেনা। কেননা এই এলাকায় সালেক চাচা ছাড়া অন্য কারো থেকে মাল পাওয়াও যাবেনা। এই ব্যবসাতেও যে সিন্ডিকেট আছে তা ভেবে নজরুল প্রথমে বিস্মিত হয়েছিল। পরে অবশ্য নজরুল বুঝেছে যে, সিন্ডিকেটের বাইরে দুনিয়ার কোনোকিছুই নেই। ফলে, এই এলাকার ভেতর একমাত্র সেই গাঁজা বিক্রেতা। প্রতি মাসে পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে ব্যবসা করে সালেক চাচা। একারণে সালেক কাকার তার মতো ওপেন হয়ে কেউ গাঞ্জা বিক্রি করতে সাহসও দেখায় না। যদিও কেউ লুকেচাপে গাঁজা বিক্রি করে তাহলে তাকে পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে সালেক চাচা। নয়তো পুলিশ দিয়ে এমন টাকা চাঁদা দাবী করাবে যাতে তার কোমড় ভেঙ্গে যায়। অর্থ্যাৎ সারাজীবন কামাই করলেও যে টাকা আয় করতে পারবেনা তা ডিমান্ড করে বসবে পুলিশ। নজরুলকে সালেক চাচা বলে, বুঝছু, যা করবু পুলিশ দিয়ে করাবু। রিস্ক নাই। মামলা খাওয়ারও ভয় নাই। খালি এক ভাগ দিবু তালেই পুলিশই তোক সবি করে দিবি। যা চাবু! তুই হামি রিস্ক লিয়ে কিসোক মরমো, ক? একারণেই মানে, পুলিশের সবখানেই হাত দেয়ার ফলে নজরুলদের মতো মাস্তানদের ব্যবসাটাতে ভাটা পড়ে তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারে। একারণেই নজরুলদের মতো মাস্তানদের পকেটে সব সময় টাকা থাকেনা। নজরুলরা যে টাকার আশায় চেয়ে থাকে সে টাকা চলে যায় পুলিশদের পকেটে। নজরুলের এক বন্ধু বলে, শালারা সবঠিক্কেরই ট্যাকা খায়। গুঁয়ের ্উপর ট্যাকা থুলেও সে ট্যাকা চাটে চাটে পকেটোত তুলে থুপি!
যাই হোক, আসর মাতিয়ে গাঁজা খাওয়ার অনেক উপকারিতাও আছে। নেশায় ঢুলুঢুলু হয়ে সবাই সবার সত্যি কথাটাই সকলের সাথে শেয়ার করে। মানুষ নিজেকে জেতাতে ধর্মীয় গ্রন্থের উপর হাত রেখে মিথ্যা কথাও বলতে পিছুপা হয়না অথচ মদের গ্লাসে মানুষ সব সময়ই সত্য কথাটাই বলে এসেছে। জগত বিচিত্র আরো বিচিত্র মানুষের আচরণ। এই মদ কিংবা গাঁজার আসরগুলাতে না বসলে দুনিয়ার অনেক কিছুই বোঝা সম্ভব হয়না।
গাঁজা খেতে খেতে নজরুল কিংবা কালু সবাই নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন। ছোট্ট একটা মাটির ঢেলাকে তারা মনে করতেছে ক্যাওক্রেডাং। একটু ফির ফির করে বাতাস প্রবাহিত হতে শুরু করলেই তাদের মনে হয় তারা সাজেক ভ্যালিতে আজ হাঁটতেছে। পকেটে এক টাকা না থাকলেও নিজেকে রাজা মনে করতে সমস্যা হচ্ছেনা কারো। খুব বেশি নেশায় ঢুকে পড়লে দুনিয়াকে টেনিস বল মনে করে দূরে ছুঁড়ে ফেলছে কেউ। এতেও আপত্তি করছেনা কেউ। তাতে আরো প্রবলবেগে আকর্ষিত হচ্ছে তাই এবার ফুঁ দিয়ে সূর্য নেভানোর চেষ্টা করছে কালু। তাতে হো হো করে হেসে উঠছে সবাই। এবার কালু একটু সম্বিৎ ফিরে পেয়ে, শুনছু তোরা, কাল কার বউ পাটক্ষেতোত ধরা পড়ছে? শুকটুর বেটি ঐ কালে মর্দার হাত ধরে ভাগছে। এসব নানান গল্প চলতে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। অর্থ্যাৎ, গাঁজার আসরে বসলে এমন কোনো সংবাদ নাই এলাকার যে সংবাদ উঠে আসবেনা গল্পে। এরকম নানাপ্রকারের সংবাদ রাখার জন্য নজরুলদের এলাকার লোকজন একজনকে তো বিবিসিই নাম রেখে দিয়েছে। এই আসরগুলোতেই একেক রাজনৈতিক নেতাদের একেকটা সোর্স থাকে। যারা এরকম আসর গুলো থেকেই এলাকার সংবাদ কালেক্ট করে। এলাকায় প্রভাব, প্রতিপত্তি বিস্তার করতে এসব নেটওয়ার্কিংয়ের ভেতর থাকতে হয় রাজনৈতিক নেতাদের সোর্সদের। তারাও উমুক চেয়ারম্যান, মেম্বারের পক্ষ থেকে খাওয়ার অফার করে। এভাবে দলাদলি সৃষ্টি হওয়ার কারণে অনেক সাধারণ গাঁজাখোরদের পকেট থেকে টাকাই বেয়ার করতে হয়না। আসরে বসলে একেকদিন একেক প্রতিনিধির লোকেরা খাওয়ায়। মানে তারা একে অপরের কাছে পৌঁছাতে নিজেদের ভেতরে হিটেহিটি লাগে।
কার পক্ষে কতজন আছে। কে কত বেশি গ্রহণযোগ্য তা মাপার জন্য একধরণের সূক্ষ্ম প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠে সোর্সদের ভেতরে। এরা অবশ্য বিনা স্বার্থে খাওয়ায় না। যদি ঐসব লোকেরা নিজ দলে না ভেড়ে তাহলে শায়েস্তাও করে বিভিন্ন উপায়ে। হয় এলাকায় সমস্যা তৈরি করে না হয় কর্মক্ষেত্রে। যদি তাও না করতে পারে তাহলে তার পিছনে পুলিশ লেলিয়ে দেয়। তারপর পুলিশ বিভিন্ন কায়দায় মানে তাকে হয় পকেটে গাঁজা অথবা ইয়াবার ট্যাবলেট ঢুকে দিয়ে অথবা কোনো অজ্ঞাত মামলার আসামী করে ধরে নিয়ে থানায় চলে যায়। থানায় যাওয়ার আগে; যেতে যেতে চাঁদা দাবী করে দর কষাকষি চলে পুলিশ ও আসামীদের ভেতরে। চাঁদা ফুলফিল হলে তবেই না তাকে ছেড়ে দেয় নতুবা সোজা শ^শুড়বাড়ি মানে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়।
এই ভয়ে সবাই টাকাও দেয়। সে টাকা ভাগ হয়। ভাগের টাকায় ঐ সোর্সের পকেটও ভারি হয়। ফলে, নিরীহ, সাধারণ গাঁজাখোরদের গাঁজা খাওয়ানোর ভেতর দিয়ে পুলিশ কিংবা ঐ রাজনৈতিক ব্যক্তির সোর্সগুলোর অনেক স্বার্থ হাসিল হয়। প্রথমত, সাধারণ মানুষদের দলে টানতে পারা যায়। দ্বিতীয়ত, যারা ব্যবসায়ী তাদের লভ্যাংশ থেকে মুনাফা পায়। তৃতীয়ত, যারা বিরোধী পক্ষ থাকে তাদেরকে হয়রানি করার ভেতর দিয়ে বিরোধী গ্রুপকে দুর্বল করা যায়।

এই গ্রামের যারা গাঁজা খায় তারা অত্যান্ত নিরীহ প্রকৃতির। সমাজের কূটচাল তারা বোঝেনা। তারা দিন আনে দিন খাওয়া মানুষ। হালাল রুটি রুজি খাওয়াই তাদের ধর্ম। তারা বোঝেনা এইসব রাজনীতির মারপ্যাঁচ।
তারা বুঝে না বুঝে ফকির লালন শাহকে ভালবাসে। তারা লালন শাহর তাদের আদর্শ খুঁজতে চায়। ফলে, লালনের বিরুদ্ধে কেউ কটুকথা বললে, তাকে ছেড়ে দিয়ে কথা বলেনা। মাঝে মাঝে তারা কুষ্টিয়ায় লালনের ছেঁউরিতে গিয়ে লালনকে স্মরণ করে আসে। আর আসার সময় অরিজিনাল গাঁজা সহ লালনের প্রতিমূর্তি নিয়ে আসে। যার সাথে একতারা, দোতারাসহ খোলতবলাও নিয়ে আসে। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে একটা লালনগোষ্ঠি কিংবা লালন একাডেমি খোলার পরিকল্পনা করে কিন্তু সেই পরিকল্পনা অল্প কিছু দিনের ভেতরেই ভেস্তে যায় জীবন সংসারের চাপে।

তাদের বাড়তি কিছু করার শক্তি সামর্থ্য নাই। খেটে খাওয়া মানুষ তারা। কেউ সারাদিন ভ্যান চালায়, কেউ জমিতে ফসল ফলায়, কেউ নদীতে মাছ ধরে সংসার চালায়। এসব কর্মজীবি মানুষেরা চাইলেও সবকিছু করতে পারেনা। আর লালনকে নিয়ে কেউ এলাকায় কিছু করবে তা কি করতে দেবে সমাজের ময়মুরুব্বীরা। কেননা তাদের চোখের লাটা ঘোরার সাথে সাথে এই এলাকাও ঘোরে। মানে তাদের ইশারা ইঙ্গিতে সব হয় এলাকায়। তারা কি চাইবে লালন একাডেমি প্রতিষ্ঠিত করতে? করবেনা। কেননা তারা মনে করে লালন একাডেমী খোলার মানেই হলো গাঁজা খাওয়ার জন্য একটা বৈধ প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া। তাদের বুঝ এটুকুই বুঝ যে,, যারা লালন লালন করে ফাল পারে তারা সবাই গাঁজাখোর। আর গাঁজাখোরেরা এ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করবে তা হতে দেয়া যায়না। ফলে, বড়োলোকদের চোখ এড়িয়ে লালন ভক্তরা কোনো কিছু করতেও পারেনা।

গ্রামের এ মাচাং থেকে ও মাচাং ঘুরে ঘুরে গ্রামীন রাজনীতিতে আরো সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকে নজরুল। এভাবে ঠুল্লোর মতো ঘুরতে থাকা দেখে নিজ গ্রামের এক বড় ভাই নিজের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে একটা চাকরি জোগাড় করে দেয়। শোন, এটি যে তোক থোনো, তুই হামার ইজ্জ্বত থুবু তো? মান সম্মান হামার যান হারায়না। কিন্তু সেখানেও গঁৎবাঁধা চাকরি তার ভাল লাগেনা। উপরন্তু মাসশেষে মাইনে যা পায় তা দিয়ে টানাটানি করে চলা লাগে তার। পকেট খরচ আর সংসার চলতেই হিমশিম খেতে হয়। এছাড়া গ্রাম থেকে শহরে যাওয়ার জন্য যা গাড়ি ভাড়া লাগে তা বহন করার জন্য উপরি কামাইয়ের দরকার পড়বে নজরুলের। উপরি কামাই না হলে নজরুলের পক্ষে চলাফেরা করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। এই উপরি কামাই করতে পারে তারাই যাদের চক্ষু লজ¦্¦া নাই, মান সম্মানের ভয় করেনা তারা চোখের পলকে নিমেষেই তা করতে পারে। যেহেতু নজরুলের একটা চক্ষুলজ্জা আছে সেহেতু তার পক্ষে উপরি কামাই করা সম্ভব হয়না। তুই তো তুই, তোর চাইতেও কত বড় বড় মানুষেরা এটা কলমের গুঁতোত কোটি কোটি ট্যাকা লিয়ে লিচ্চে, আর তুই আচ্ছু মান সম্মান লিয়ে। তোক দিয়েই কিচুই হবির লয়। তুই এই দুনিয়ের সিস্টেমই জানিস নে। ইংকে করেই দেশের সগলি চলে। অরজিনেল ট্যাকা কামাই করবের চালে সে সংসারোত আয় উন্নতি কিছুই হবিনে, বুঝচু। যিংকে করে খালি হাত লিয়ে আসচু সিংকে খালি হাতেই লিয়ে যাওয়া লাগবি। কিছুই করবের পারবুনো। কিছুই করবের না পায়্যা খালি হা-হুতাশ করবু। এছাড়া আর কি করবু? নজরুলের বন্ধু নজরুলকে যাই বলুক, নজরুল সামান্য টাকার জন্য এতো নিচে নামবে না? যদি হলোহিনি বেশি ট্যাকা, যা খায়্যা পড়ে জিন্দেগী কাটে যাবি। দুনিয়েত ট্যাকার কুনু চিন্তে করা লাগবির লয়, তালে না হয় হলোনি। ঐ হাত তোলা দশ পাঁচ ট্যাকা হামি খামু না। হামি খালে কাতল মাছই খামু!
এইখানে উপরি কামাই যেহেতু নজরুল করতে পারেনা। কিংবা তার এসবে ধান্ধাই থাকেনা সেকারণে এই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে তার পক্ষে ৬ মাসের বেশি চাকরি করতে পারেনা।

চাকরি ছেড়ে দিয়ে সে আবার পূর্বেকার বোহেমিয়ান জীবন যাপন শুরু করে। সকাল হলেই গ্রামের বিভিন্ন জনের সমস্যা নিয়ে চলে দেন-দরবার। বিকাল হলেই দুই তিনজন সঙ্গী সাথীকে নিয়ে হাটবন্দরে যাওয়া। সেখানে গিয়ে ইউনিয়নের নানা প্রকারের গোয়েন্দা শ্রেনীর লোকের সাথে উঠাবসা হয় তার। অমুক ওয়ার্ড থেকে কে কে মেম্বারের ক্যান্ডিটেট এবার? চেয়ারম্যানের ক্যান্ডিটেট কে কে? অর্থ্যাৎ, ইউনিয়নের সকল রাজনীতির তথ্য সে মাথায় পুরে নিয়ে পুরোদস্তুর না হলেও অকেশনাল রাজনীতিবিদ হিসাবে পরিচিত হতে থাকে। এভাবে আস্তে আস্তে ইউনিয়ন থেকে জেলা সদরের নেতা, কর্মীদের সাথেও পরিচিত হতে থাকে ধীরে ধীরে। দিনের পর দিন এভাবেই চলে নজরুলের জীবন। আর রাতে সারাদিনের উপলব্ধিটাকে লেখার পাতায় লিপিবদ্ধ করতে থাকে।

সে প্রথমে বুঝতে চায়নি রাজনীতি মানেটা কি? রাজনীতি যে আদর্শের একটা ব্যাপার সে ব্যাপারে তার জ্ঞান-গম্মি কিছুই নাই। কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নাই। নেতাদের সাথে চলতে পারছে, নেতাদের সাথে ফটো উঠাতে পারছে, এলাকার দুই একজন লোক নেতা বলে ডাকছে, দুই একটা সভা-সমিতিতে ডাক পড়ছে, সর্বোপরি দিনশেষে পকেটে কিছু টাকা উঠতেছে এবং তা দিয়ে দিনটা কোনোক্রমে পার হচ্ছে এটাই তার জীবনে মহা কিছু বড় ব্যাপার মনে করে। আদর্শ টাদর্শ দিয়ে রাজনীতি করে লাভ নাই- নজরুলকে বলে কালু। আর আমাদের মতো চুনেপুটিদের আদর্শ ফাদর্শ জেনে- বুঝে কি হবে? ওসব বোঝাপড়া বড়লোকদের দরকার। তারা দিন আনা দিন খাওয়া লোক- তাদের আদর্শ মেপে চললে; না খেয়ে ভূত হয়ে থাকা লাগবে। বেন্নে মানষের জন্যি এগ্লে লয় বুঝছু নজরুল!

যেভাবে নজরুলের দিনগুলি একের পর এক পার হচ্ছে আর এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে তো নজরুলের ভবিষ্যৎ কানা হয়ে যাবে। এমন বোধ নজরুলেরও আছে। কিন্তু এ মুহুর্তে কি করার আছে নজরুলের? তার এমন কোনো সার্টিফিকেটও নাই যে, যা দিয়ে সে মোটামুটি মানের একটা চাকুরি সংগ্রহ করে জীবিকা-নির্বাহ করতে পারে।
সে সামান্য ডিগ্রী পাশ করা ছেলে। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে, দাঁতের উপর দাঁত দিয়ে কোনোমতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ডিগ্রী পাশ করেছে। কিন্তু বর্তমান দুনিয়ায় এই পাশ দিয়ে মোটামুটি মানেরও চাকরি জুটবেনা। মাঝখানে অবশ্য মুদি দোকানের চাকরি ছাড়ার পর তার আরেকটা চাকরি জুটেছিলো সেটা হলো হোমিও কোম্পানিতে সেলসম্যানের চাকরি।
সে আরেক গল্প। দারুণ রোম্যান্টিক সে গল্প। নামে সেলসম্যান হলেও নজরুলের ফিল্ড ওয়ার্ক করতে হয় না। অফিসে বসেই কাস্টমারদের সাথে মোবাইলে কমিউনিকেট করা লাগে শুধু। রোদ বাও পোহাইতে হয়না। এসি রুমে বসে কাজ করতে করতে দারুণ লাগে নজরুলের।
নজরুল যে কোম্পানীতে চাকরি করে সে কোম্পানী বিভিন্ন প্রকারের হার্বস জাতীয় ঔষধ তৈরি করে। বাতের ব্যথার ঔষুধ, দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বন্ধ করার ঔষুধ, দীর্ঘ সময় ধরে সেক্স করার ঔষুধ, হজমশক্তি বৃদ্ধি করার ঔষুধ। এইগুলাই এই কোম্পানীর উৎকৃষ্ট পন্য।
এই কোম্পানীতেই চাকরি করে একটা মেয়ে। অপূর্ব সুন্দরী সে। তার ডাক নাম রোজিনা। এই রোজিনা হেকিমের সাথেই পরবর্তীতে নজরুলের লটরপটর শুরু হয়। মানে, নজরুলকে প্রথম দেখাতেই চয়েস করে ফেলে মেয়েটি। নজরুলের পছন্দ হয়। আজকে চোখে চোখ রাখা, কালকে দুইটা কথা বলা, পরশু আরেকটু আগ বাড়িয়ে মুচকি হাসা। এভাবেই ধীরে ধীরে রোজিনার প্রেমে পড়ে নজরুল। নজরুলও খুবই খুশি হয় এই ভেবে, তার জীবনটা স্বার্থক হতে চলেছে। এই প্রথম কেউ তাকে দেখে প্রপোজ করেছে। জীবনে কেউ তারে পছন্দ করে নাই। কেউ তারে লাভ লেটার কিংবা আই লাভ ইউ বলে নাই। জীবনে এই প্রথম কোনো মেয়ে তাকে পছন্দ করেছে- আই লাভ ইউ বলেছে। নজরুলের জীবনে এটা সঞ্জীবনী শক্তির মতো। ফলে, কোনোক্রমেই তাকে ফিরায়া দেয় না। সে যা চায় তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে।
নজরুলের বসার রুম আর রোজিনার বসার রুম পাশাপাশি হওয়ার ফলে রোজিনার সাথে নজরুলের সবসময়ই চোখাচোখি, ঘেঁষাঘেষি চলতেই থাকে। এভাবে চলতে চলতে নজরুল এবং রোজিনার এমন একটা কামরূপ ভাব চলে আসতে থাকে যে অফিসে বসেই তার আকাংখার প্রতিফলন ঘটাতে চায়। সে কি তুমুল উত্তেজনা। অফিস থেকে এক সঙ্গে বের হয়। অফিসে কারো কাজ বেশি থাকলে সে অফিসের বাইরে এসে ওয়েট করে। এরপর এক সাথে কতো ঘোরাঘুরি; অনেক জায়গায়, একসাথে, অনেকভাবে। ভবিষ্যত জীবন কেমন হবে তাদের- তার গল্প- তাদের সময়ের গল্প বলতে ও শুনতে থাকে একে অপরে।
কিন্তু না তাদের সম্পর্ক পরিণতি পায়না বিভিন্ন কারণেই। রোজিনা সত্যি করেই ভালবাসতো নজরুলকে। নজরুলও ভালবাসতো রোজিনাকে। কিন্তু নজরুলের কিছু লিমিট ছিলো ফলে, নজরুল সেটুকু পর্যন্তই পৌঁছায় যেটুকু পর্যন্ত পৌঁছালে বিয়ের আগেই নজরুলকে কিক আউট করে দিতে বাধ্য হয় রোজিনা। এরকম একটা পলিসি মেকিং করে নজরুল আগায় রোজিনার দিকে।
নজরুল বুঝতে চেষ্টা করে যে, রোজিনাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিলে তার উন্নতি বলতে যা বোঝায় তা তার হবেনা। একারণে, রোজিনা তার প্রথম ভালবাসা হলেও তাকে গ্রহণ করা যাবেনা। এর চাইতে রোজিনা যতোদিন আছে ততোদিন তার সাথে মিলেঝিলে থাকাটাই মোক্ষম মনে করে। নজরুল এইখানে ফ্রয়েডীয়।
এদিকে বিষয়টা নিয়ে অনেকদুর পর্যন্ত গড়ালে একদিন কোম্পানীর এমডি নজরুলকে ডেকে পাঠায়। -বলে, তোমার আর রোজিনার নামে কি শুনতেছি এইগুলা?
নজরুল বলেঃ কি শুনতেছেন?
-শুনলাম রোজিনা আর তোমার মধ্যে নাকি সম্পর্ক আছে?
নজরুল বলে, হ্যাঁ আছে।
-রোজিনাকে যদি সত্যিই ভালবেসে থাকো তাহলে বিয়ে করো! এভাবে অফিসে ঢলাঢলি করলে অফিসের শৃংখলা, পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়।
কোম্পানির এমডি বলে, প্রয়োজনে মধ্যস্থাকারী হিসেবে আমিই তোমাদের দু’জনের ফ্যামিলিতে প্রস্তাব পাঠাবো।
কোম্পানীর এমডি বলে, আমি যতদুর জানি, রোজিনার ফ্যামিলি গরীব। তোমার পরিবার কি তাকে মেনে নেবে?
আর বিয়ে না করতে চাইলে মিছেমিছিই মেয়েটিকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলিও না। মিথ্যা স্বপ্ন তাকে দেখিয়োনা। মেয়েরা খুবই কোমল স্বভাবের হয়। যদি একবার কোনো ছেলে মেয়েদের স্বপ্ন দেখায় তাহলে সে স্বপ্ন পূরণ না হলে তাহলে তারা মারাত্মক শকড হয়। এমনকি তারা তাদের জীবনের পরোয়াও করেনা।
নজরুল মনে মনে বলে, হ্যাঁ, রোজিনারা গরীব হওয়ার জন্যই তো ওকে বিয়ে করার সাহস হচ্ছেনা তার। বড়লোক হলে কওয়া লাগে (নিজের সাথে নিজেই কথা বলে)!

নজরুলের রোজিনার প্রতি লোভ আছে। সে লোভ শুধুমাত্র দেহের কাছে। ওর দেহটাকে ও খুব ভালবাসে। মনে আছে, তার ঠোঁট, চোখ, চুলে সে কি উন্মাদনা। ঠোঁটে চুমু দিলেই কেঁপে কেঁপে ওঠে। যখন ওর বুক উন্মুক্ত করে তখন মনে হয় তার চোখের সামনে ভিসুভিয়াস ভেসে উঠছে। উত্তপ্ত কিন্তু মোলায়েম। কি সুন্দর নরম বুক; গোটা বুকটায় কবুতরের মাংসে ভরা। যাকে স্পর্শ করলেই বারবার বেঁকে যেতে থাকে রোজিনা। কিন্তু ঐ পর্যন্তই রোজিনার প্রতি ভালবাসা।

রোজিনা বারবার বিয়ের তাগাদা দেওয়ার পরও রোজিনার বাড়িতে আর বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়না নজরুলের। বরং রোজিনার চাইতে হোমিও কোম্পানীর মালিকের সুন্দরী ভাগ্নীকে মনে মনে ভালবাসতে শুরু করে। কিন্তু কখনোই বলা হয়না তাকে। এই ভয়ে যে, রোজিনাকে যে অপরাধে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়ে উঠেনি তার; সেই অপরাধে তো নজরুলকেও প্রত্যাখ্যান করতে পারে এমডির ভাগ্নী। মানে, কোম্পানীর মালিকের ভাগ্নি বড়লোক হওয়ার কারনে সামান্য সেলসম্যানের সাথে কিভাবে বিয়ের করার দুঃসাহস দেখাবে। ফলে, এই ভালবাসাটা বুকের ভেতরই গুঞ্জরণ করে শুধু কিন্তু বলা হয়ে ওঠেনা। তো এভাবে চলতে চলতেই একদিন সাহস করে কোম্পানীর এমডির ভাগ্নির কাছে দুটো গোলাপ হাতে নিয়ে দাঁড়ায়। নজরুল গোলাপের কলি দুটি তার হাতে দিলে কোম্পানীর এমডির ভাগ্নিও হাত পেতে নেয়। এমডির ভাগ্নি একটা থ্যাংক ইউ আর সাথে একটা মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেলে নজরুল ভেতরে ভেতরে খুব খুশি হয়। নজরুল ভাবে তার তাকে পছন্দ করেছে সে। নইলে মুচকি হাসি দিয়ে চলে যাবে কেন? সে সারারাত ঘুমাতে পারেনা। ছটফটাতে থাকে। বিছানাতে শুয়ে এপাশ ওপাশ করে। কখন সকাল হবে- অফিসে যাবে কখন। তাকে আবার দেখবো। দুইটা ভাল মন্দ কথা বলবে। একটা মুচকি হাসি দেখবে। আস্তে আস্তে নতুন সম্পর্ক তৈরি হবে। আমরা কথা দু’জনার হাত ধরে হাঁটবো সোজা রাস্তায়। কিংবা জ্যোসনা রাতে ছাদের দাঁড়িয়ে দু’ কলি রবীন্দ্রসংগীত গাইবো এই হেঁড়ে গলায়। পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে বিলীন হয়ে যাবো।
এসব ভাবতে ভাবতে কত রাতে যে ঘুমিয়ে পড়েছে তার হিসাব রাখেনি নজরুল। ঘড়ির এলার্ম প্রথম দু’বার দিলেও টের পায়নি। তৃতীয় বার দিলে দেখে জানালার ফাঁক গলে সকালের রোদ তার গালের উপর এসে পড়েছে। আজকের রোদটা দারুণ মোলায়েম। দিনটা দারুণ মনে হচ্ছে নজরুলের কাছে। আজকের দিনটি তার জন্য শুভ হওয়ারই দরকার। এমডির ভাগ্নি গতকাল যেভাবে গোলাপ ফুল রিসিভ করেছে তাতে নজরুলের ভেতর আশার সঞ্চার হওয়ারই কথা। হবেই না কেন? নজরুল গোলাপ দিতে যেভাবে ভয় পাইতেছিলো; দুরুদুরু করতেছিলো নজরুলের বুক। দেবে কি দেবেনা এইসব ভাবতেই ভাবতেই এমডির ভাগ্নিই যখন বললো, এই গোলাপ দুটি নিশ্চয় আমার জন্য এনেছেন। তখন কি আর নজরুলের বুকে ভয় থাকে? তার বাড়িয়ে গোলাপ নেওয়ার ভঙ্গি, তার চাহনি, তার মুচকি হাসি নিশ্চয় পজিটিভ সাইনই।
ফলে, তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে ভাল ভাল শার্ট প্যান্ট পড়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
আজকের দিনটা ভাল হতে পারে। আবার নাও ভাল হতে পারে। অনেকটা দোমোনামুনি হতে থাকে নজরুলের মনের ভেতরে। হিতে বিপরীত যদি হয় তাহলে তো চাকরিই থাকবেনা তার। এমডির ভাগ্নি বলে কথা। অনেকটা মঙ্গলগ্রহের মতো অবস্থা। বিজ্ঞানীরা যেমন জানেনা মঙ্গলগ্রহের অভিযানে তাদের কি ফিডব্যাক আসবে। তবু পৃথিবীর মঙ্গলার্থে তাদের এই অভিযানে যেতেই হবে। তেমনি নজরুলেরও একই অবস্থা। যদি এমডির ভাগ্নি তার বসকে কোনো কিছু না বলে তাহলে তার জন্য লাকি। তার উন্নতি আর ঠেকায় কে। একেবারে গুঁটি ফিট। জিরো থেকে হিরো হয়ে যাবে। সে শুধু ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং ঝুলে দিয়ে খাবে। আর মাস শেষে ইনকোয়ারি করবে। কোথায় কোন সমস্যা, কি করতে হবে এই রকম দিকনির্দেশনা দিতে থাকবে অফিসের সবাইকে। অফিসে যখন ঢুকবে তখন সবাই তাকে দেখে দাঁড়িয়ে আস সালামু আলাইকুম বলবে। কেমন বস বস লাগবে তাকে। সে ইচ্ছা করলেই যে কাউকে অফিসে ইন কিংবা আউট করার রাখবে। দু’ সপ্তাহ পর পর দুবাই, মালয়েশিয়া কিংবা আমেরিকাতে যাবে পারিবারিক ট্যুরে, নয়তো অফিসিয়াল ট্যুরে। অর্থ্যাৎ, ট্যুর ম্যুর লেগেই থাকবে প্রতি মাসে। শপিং করবে বড় বড় শপিংমল থেকে। বড় বড় দেশের সুইমিংপুলে সাঁতার কাটবে। এসব ভাবতে ভাবতে নজরুল চলে এসেছে অফিসে।

আজ অফিসের আবহাওয়া কেমন গুঁমোট। গুমগুম করছে সবকিছু। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছেনা পর্যন্ত। মাথা নিঁচু করে কাজ করছে সবাই, একমনে। নজরুলের পাশের ডেস্কের কলিগ পর্যন্ত তার দিকে তাকাচ্ছেনা। নজরুল তাকে ডাকতেই সে সাপের মতো ফোঁস করে উঠে। বলে, ঘাউরো মাছে গু খায় আর সব মাছের নাম হয়। নজরুল বুঝতে পারেনা সে আসলে বলতে চাচ্ছেটা কি? নজরুল কারো কাছে থেকে কোনো কিছু না শুনে এটেন্টডেন্স বইয়ে স্বাক্ষর করে ডেস্কে জমা থাকা কাজে মনোনিবেশ করে। সারাদিন যায়, কেউ কথা বলেনা নজরুলের সাথে। লাঞ্চ আওয়ারে যাদের সঙ্গে বসে লাঞ্চ করতো তারাও আজকে যে যার মতো আগেই লাঞ্চ সেরে ফেলেছে। যে কোম্পানীর এমডি লাঞ্চ আওয়ারের পরপরই নজরুলকে ডেকে পরেরদিন কি কি কাজ করতে হবে তার একটা দিক নির্দেশনা দিতো আজকে সেটার জন্য ডাক পড়তেছেনা। এক কলিগ এমডির রুমে প্রবেশ করতেই এমডিকে দেখা গেলো চেয়ারে, বেশ রাগান্বিত মুডে বসা।
অফিস আওয়ার শেষ দিকে। আর মাত্র ঘন্টা কিংবা আধাঘন্টা বাকি রয়েছে। এমডির পি এ জানালো, নজরুলকে তার বস ডাকতেছে। নজরুল এবার হাফ ছেড়ে বাঁচলো, যাক, অন্তত সব ঠিকঠাকই আছে মনে হচ্ছে। আগামীকালের কাজ কি হবে তার জন্যই তাকে ডাকতেছে। নজরুল কাজের ফাইল নিয়ে রুমে প্রবেশ করার পর, বলে, স্যার আমি কি বসতে পারি? এমডি বলে, দাঁড়াও! দাঁড়িয়ে থেকেই কথা বলো। এমডির গলার ভারি ভয়েসে তার জিঁউ শুঁকিয়ে আসে। কথা বলতে বলতে তোঁতলাতে থাকে। মনে মনে ভাবে, আজ হছে,-দিবি খানিক। অফিসের কোনো কাজ কি সে ভুল করেছে? মনে পড়েনা তো। সব কাজেই তার টুয়েন্টিটাইট ভাবে করা। তাহলে আজকে স্যার এমন আচরণ করতেছে কেন? এমডি বলতেছে, নজরুল, তুমি কতো টাকা মাইনে পাও? তোঁতলাতে তোঁতলাতে বলে, আপনি যা দেন! এমডি বলে, সোজা উত্তর দাও: আমি তোমার কাছে থেকে ডিপলোমেটিক এন্সার চাইনি। ভুলে যেয়োনা তুমি আমার অফিসে চাকরি করো মাত্র। তুমি আমার বিজনেসের শেয়ার হোল্ডার নও যে, আমি প্রশ্ন করলে তুমি ডিপলোমেটিক এন্সার করবে? বেতন কত তোমার? –নজরুল বলে, ১০,০০০/-টাকা। এই টাকা দিয়ে সংসার চলে? নজরুল বলে, টেনেটুনে চলতে হয়। নজরুল মনে মনে ভাবে, তার বেতন বৃদ্ধি করার জন্যই বোধ হয় তাকে জিজ্ঞাসা করছে। খুঁটিনাটি জানতে চাইছে। তাহলে কিভাবে তুমি আমার ভাগ্নিকে প্রপোজ করো। এ সাহস তোমার হলো কিভাবে? না, স্যার আমি করিনি স্যার। আপনার ভাগ্নিই আমার কাছে থেকে ফুল চেয়ে নিয়েছে। মিথ্যা কথা বলার জায়গা পাও নাই। আমার ফুলের মত ভাগ্নি তোমার কাছে থেকে নেবে ফুল? মিথ্যা কথা বলার জন্য এইমুহুর্তেই তুমি আমার সামনে থেকে চলে যাও। আর শুনো, তোমার আর এইখানে আসার দরকার নাই। কাল থেকে তোমার ডেস্কে নতুন একটা ছেলে জয়েন করবে। বুঝতে পেরেছো? স্যার, আমার ভুল হয়েছে। আমার ভুল হয়েছে। বলতে বলতে নজরুল প্রায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু বসের আর গলেনা। অশ্রুসিক্ত হয়েই সে সালাম দিয়ে বিদায় নিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে আসে।
নজরুলের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। তার খামখেয়ালিতে আজ তার চাকরি নাই হয়ে যেতে পারে এটা তার কল্পনাতেও মাথায় আসেনি।

(চলবে..)

আরও পড়ুন

সর্বাধিক পঠিত