সুপ্রিয় অনি

নয়
কাঁথার ওম উপভোগ করতে করতে অনি আজমাইনের চেহারাটা মনে করে হাসছে। অনির আজ আনন্দের সীমা নেই। আজমাইন আজ বেশ একটা শিক্ষা পেয়েছে। অবশ্য এটার পুরো কৃতিত্ব সেই মেয়েটার। তবে রুমন যদি আজ মেয়েটার কাছে আজমাইনকে দিয়ে মাফ না চাওয়াতো তাহলে আজ নির্ঘাত বিষয়টা মা-বাবা অবধি গড়াতো।
আজমাইনের সবকিছুতেই সবজান্তা ভাব। অথচ রুমন কত কী জানে, গাদি গাদি বই পড়ে ও। কিন্তু রুমনের ভেতর জাহির করা বিষয়টা নেই। রুমনের সাথে যখনই দেখা হয়, তখনই ওর হাতে কোনো না কোনো বই দেখা যায়। আজ রুমনের হাতে ছিল ‘সুকুমার রায়ের ছোটদের শ্রেষ্ঠ গল্প’। সেই বই নিয়েই ঝামেলার সূত্রপাত।
হাফিজ স্যারের বাসাটা চৌরাস্তার কাছে, সবুজ কানন স্কুলের উত্তর পাশে। প্রতিদিন যে যার সিট বুঝে বসে যখন হুল্লোড় শুরু করে তখন রুমন নিজের জন্য নিরিবিলি একটা জায়গা তৈরি করে ফেলে স্যার না আসা পর্যন্ত গল্পের বই খুলে বসে থাকে। আজ রুমনের হাতের বই দেখে আজমাইন ঠোঁটে চুকচুক আওয়াজ করেছে, ‘ওরে রুমন, তুই এখনো এইসব পড়িস? এ তো বাচ্চাদের বই! কী রে বাবা-মা রাতে ঘুমানোর সময় এখনো রূপকথা শোনায় বুঝি…ওরে আমার বাবুসোনারে এখনো ফিডার খায়!’
রুমন সহজে রাগ করে না। আজমাইনের কটাক্ষে রুমন শান্তভাবেই উত্তর দিয়েছিল।
‘আমি সবই পড়িরে। শার্লক হোমস, সেবার ক্লাসিক থেকে সুকুমার, জাফর ইকবাল। এক এক বইয়ের একই স্বাদ।’
এরপর আজমাইন স্যারের কাছে পড়ার সময় থেকে ফিরতি রাস্তাটুকুতে পুরোটা সময় আজমাইনের পিছনে লেগে রইল। বই নিয়ে ক্ষেপাতে ক্ষেপাতে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটা মেয়ের গায়ে আজমাইনের লাগলো ধাক্কা। মেয়েটা বকা দিতেই আজমাইন একটা বাজে কথা বলে মেয়েটাকে চোখ মেরে দিলো। মেয়েটা ঠিক তোড়া দিদির মতো তেড়ে এসে আজমাইনের গালে চড় বসিয়ে দিলো।
অনি, রুমন, ধীমান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। মেয়েটা এক পর্যায়ে আজমাইনের হাত ধরে টানাটানি শুরু করেছিল। আজমাইনকে নাকি ওর বাবা-মার কাছে নিয়ে দিয়ে আসবে। মেয়েটাকে চেনে না ওরা কেউই। মনে হয় কলেজে পড়ে। কী দৃঢ় মুখটা! তোড়াদি রেগে গেলে ঠিক ওরকম লাগে। অনি ভয়ে কিছু বলতে পারছিল না। হঠাৎ রুমন বললো, ‘আপু মাফ করে দেন।’ রুমন হাতে ধরে আজমাইনকে নিয়ে মেয়েটার কাছে মাফ চাওয়ালো। মেয়েটা যাবার আগে আজমাইনের গাল ছুঁয়ে বলে গেলো, ‘রাস্তাঘাটে তোর বোনকে দেখে রাখিস, তোর মতো এমন অনেক ছেলেই তো পথে পথে ঘুরছে।’
আজমাইনের চেহারাটা দেখার মতো হয়েছিল। শুধু ও কেনো, ওরা সবাই ঘাবড়ে গিয়েছিল।
মেয়েদের ছেলেরা চোখ মেরেছে আর সেই দলে অনি ছিল শুনলে বাবা-মা নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পেতো। অবশ্য অনির বাবা অন্যরকম মানুষ। শুনে নিজেই খানিক চোখ নাচিয়ে অনিকে ক্ষেপাতো। কিন্তু মা! মাতো খুব কষ্ট পেতো। মায়ের কষ্ট অনির সহ্য হয় না। কিন্তু মায়ের কষ্ট দেখতে পেলেও অনির আজকাল মাকে জড়িয়ে ধরে দুটো কথা বলতে কেমন বাঁধে। তাই অনি চেষ্টা করে মায়ের কষ্টের সময়য়টাতে পারতপক্ষে মায়ের কাছাকাছি না থাকতে আর মায়ের কষ্টের উৎস না হতে। তবু মাঝে মাঝে কিছু ঘটনা ঘটে যাতে অনির হাত থাকে না। আজ যেমন ঘটল।
রোজ আজমাইন, ধীমান, সবুজ, রাজনদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরে অনি। ওরা ফেরার সময় অযথাই দেরি করতে চায়। কিন্তু রাস্তায় ফালতু সময় নষ্ট করতে অনির ভাল লাগে না। বিশেষ করে আজমাইনকে একটু পাত্তা দিলেই অবস্থা খারাপ। সেদিন তো ফেরার সময় গার্লস স্কুলের ছুটির অপেক্ষায় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েই পড়লো। এক দল মেয়ে যাচ্ছে আর সেসময় আজমাইন শীষ দিয়ে উঠলো। মেয়েদের ভিড়ে শম্পাও ছিল। শম্পা অনিকে দেখে কী অবাক চোখে যে তাকাচ্ছিল। লজ্জায় অনি দ্বিতীয়বার ওর দিকে মাথা তুলে তাকাতে পারেনি। পরে আজমাইনকে দিব্যি দিয়েছে অনি, রাস্তায় যদি কোনোদিন মেয়েদের দেখে শীস দেয় তবে ওর সাথে জীবনের ছাড়াছাড়ি। আজমাইন হাসছিল আর বলছিল, ‘আরে দোস্ত, তুই রেগে যাস ক্যান? যা কথা দিলাম তোর সামনে আর শীস দিমু না।’
অনি রেগে গিয়েছিল, ‘তার মানে আমি সাথে না থাকলে তুই এমন করবি?’
আজমাইন একটা ফিঁচকে হাসি হাসছিল দেখে রাগে অনির গা জ্বলে যাচ্ছিল। আজমাইন বরাবরই এমন। সবসময়ই একটা জ্যাঠামি ভাব ওর। শুধু তাই না বন্ধুদের নিয়ে অর্থহীন কৌতুক করে সে অনবরত। আবার বন্ধুদের মধ্যে ঝামেলাও বাধায়। সেদিন ক্রিকেট খেলার সময় অনির গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছে ও। তবু কী এক রহস্যময় কারণে অনি বা ওর বন্ধুরা কেউই ওর বন্ধুত্বের আকর্ষণ ছাড়তে পারে না।
(চলবে)

আরও পড়ুন

সর্বাধিক পঠিত